আজ বিশ্ব পুষ্টি দিবস

অপুষ্টিতে জন্ম নিচ্ছে ৩৯% কম ওজনের শিশু

আপডেট : ২৮ মে ২০২৫, ০৭:২৬ এএম

দেশের ৫৬ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা নারীর গর্ভাবস্থার শেষভাগে প্রয়োজনের তুলনায় কম ওজন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারণে ৩৯ শতাংশ শিশুই জন্ম নিচ্ছে কম ওজন নিয়ে। অর্থাৎ প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে চারজনই কাক্সিক্ষত ওজনের চেয়ে ১০ শতাংশ কম ওজন নিয়ে জন্ম নিচ্ছে। এমনকি গ্রামের তুলনায় শহরের নিম্ন আয়ের পরিবারের অন্তঃসত্ত্বা নারীরা প্রাণিজ আমিষ, জিংক ও স্নেহজাতীয় খাবার কম খাচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআর,বি) মাতৃপুষ্টি শীর্ষক এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি করেছেন প্রতিষ্ঠানের পুষ্টি গবেষণা বিভাগের সহযোগী বিজ্ঞানী ডা. এসএম তাফসীর হাসান।

গবেষণায় গর্ভাবস্থায় সুষম খাদ্যগ্রহণ, চিকিৎসকসেবা নেওয়া এবং মা ও শিশু পুষ্টির গুরুত্ব নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই বিজ্ঞানী মা ও শিশুর এ অপুষ্টিজনিত চিত্র ‘অপুষ্টির দুষ্টচক্র’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, সব মিলে এসব পরিবার অপুষ্টির একটি দুষ্টচক্রের মধ্যে আবর্তিত হয়। অর্থাৎ দারিদ্র্য ও অসচেতনতার কারণে দেশে পুষ্টির অভাবে গর্ভকালে প্রয়োজনের তুলনায় মায়েদের কম ওজন বাড়ে। এতে কম ওজনের শিশু জন্ম নেয়। সেই শিশু খর্বকায় ও কম বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ শিশুদের কৈশোরও অপুষ্টির মধ্য দিয়ে যায়। অপুষ্টির শিকার মেয়ে শিশুটি পরিণত বয়সেও অপুষ্টির অভাবে ভুগতে পারে এবং সে পরে মা হলে আবারও অপুষ্ট শিশু জন্ম নেয়। এটা অপুষ্টির একটি দুষ্টচক্র।

এই গবেষক বলেন, বাংলাদেশে মাতৃ ও শিশু পুষ্টির অবস্থা ভালে নয়। আমাদের পুষ্টি বাড়াতে হবে। এখানে মায়েদের গর্ভাবস্থায় প্রয়োজনীয় ওজন বৃদ্ধি হচ্ছে না। অপুষ্টিরও ঘাটতি আছে। এর ফলে তাদের কম ওজনের বাচ্চা প্রসব করার ঝুঁকি বাড়ে, অপরিণত শিশুর জন্ম হতে পারে, পেটের মধ্যে বাচ্চা মারা যেতে পারে এসব বেশ উদ্বেগজনক অবস্থায় বাংলাদেশ।

অবশ্য প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের দেশের মানুষের পুষ্টি নিশ্চিত করতে খাবারের পুষ্টিমান সুরক্ষায় জোর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ভোজ্য তেলের পুষ্টিমান বজায় রাখতে আলো প্রতিরোধী অস্বচ্ছ প্যাকেজিং নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় অস্বাস্থ্যকর ড্রামে খোলা ভোজ্য তেল বাজারজাতকরণ বন্ধে সরকারি নির্দেশনার দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

কম ওজনের মা জন্ম দিচ্ছে কম ওজনের শিশু : ডা. এসএম তাফসীর হাসান বলেন, ৩৯ শতাংশ যে গর্ভাবয়সে জন্মেছে সে তুলনায় তাদের ওজন কম। অর্থাৎ ১০ জনে চারজন শিশু প্রয়োজনের তুলনায় কম ওজন নিয়ে জন্ম নিচ্ছে। এসব শিশুর কাক্সিক্ষত ওজনের চেয়ে ১০ শতাংশ কম ওজন। ২৫০০ গ্রাম ওজনকে স্ট্যান্ডার্ড ধরা হয়। তবে ছেলে ও মেয়ে শিশু এবং গর্ভাবয়সের অনুপাতে বাচ্চার ওজন নির্ধারণ করা হয়।

এ গবেষক জানান, পুরো গর্ভাবস্থাকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। ২৮ সপ্তাহ থেকে গর্ভপাতের শেষ পর্যন্ত তৃতীয় বা শেষ ভাগ বলা হয়। তৃতীয় ভাগে এসে ৫৬ শতাংশ মায়ের ওজন কম হচ্ছে। অথচ বাচ্চার ওজন নির্ভর করে মায়ের তৃতীয় ভাগের ওজনের ওপর। এ সময় মায়ের ওজন না বাড়লে প্রসব নেওয়া বাচ্চার ওজনও বাড়বে না।

গর্ভাবস্থায় কম ওজনের পাঁচ কারণ : এই বিজ্ঞানী বলেন, গর্ভাবস্থায় মায়ের কম ওজনের কারণ হলো মায়ের অধিক বয়স, অর্থাৎ যাদের বয়স ৩৫ বছর বা তার বেশি, যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কম, দরিদ্র পরিবার থেকে আসা, উচ্চতা কম বা খর্বকায় মা, যে মায়েদের বাচ্চা আছে। এসবই অপুষ্টিজনিত সমস্যা। অপুষ্ট মা কখনই পুষ্ট শিশু জন্ম দিতে পারে না।

মৃত্যুঝুঁকি বেশি : ডা. এসএম তাফসীর হাসান বলেন, যে বাচ্চা কম ওজন নিয়ে জন্ম নিচ্ছে, তারা স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিতে পড়ছে। স্বল্পমেয়াদি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে জন্মের পরপরই এসব বাচ্চার অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়। অর্থাৎ জন্মের ২৮ দিনের মধ্যেই বেশি মারা যায়। এসব বাচ্চার চিকিৎসায় আবার হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। এতে পরিবার আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এসব বাচ্চা বড় হলে তাদের খর্বকায় হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ কম হবে। সে কম বুদ্ধিমান হবে। অধিক বয়সে বড় হলে তাদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ইত্যাদি রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকবে। বিশেষ করে এ ধরনের বাচ্চা যদি মেয়ে হয়, তাহলে সে বড় হয়ে মা হবে ও আরেকটি অপুষ্ট শিশু জন্ম দেবে।

সুষম খাবার কম খাচ্ছে : ঢাকার একটি বস্তি ও মতলবে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ওপর আইসিডিডিআর,রিব পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, গ্রামের তুলনায় শহরের নিম্ন আয়ের পরিবারের নারীরা প্রাণিজ আমিষ, জিংক ও স্নেহজাতীয় খাবার কম খাচ্ছেন। শহরের অন্তঃসত্ত্বা নারীরা গ্রামের নারীদের তুলনায় ভাত বেশি খান। গর্ভাবস্থায় নারীরা মাত্র ২৬ শতাংশ ক্যালসিয়াম, ৪২ শতাংশ আয়রন ও ৩১ শতাংশ ভিটামিন ‘এ’ যুক্ত খাবার খান।

গর্ভকালে কতটুকু ওজন বৃদ্ধি প্রয়োজন : এমন প্রশ্নের উত্তরে এই বিজ্ঞানী বলেন, সাধারণত গর্ভে ৩৯-৪০ সপ্তাহ পূর্ণ করে জন্ম নেওয়া শিশুর ওজন ২ হাজার ৫০০ গ্রামের কম হলে কম ওজন ধরা হয়। অবশ্য ২৯ বা ৩২ সপ্তাহ বা বিভিন্ন সপ্তাহ পূর্ণ করে জন্ম নেওয়া ছেলেমেয়ে শিশুর ক্ষেত্রে কম ওজন পরিমাপের তারতম্য আছে। তবে গর্ভাবস্থায় একজন নারীর ঠিক কতটুকু ওজন বৃদ্ধি হওয়া উচিত সেটার বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক কোনো গাইডলাইন নেই। এক ধরনের প্রচলিত গাইডলাইন ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বে ১৬ বিজ্ঞানীর একটি টেকনিক্যাল ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়েছে। এই দলে আমিও আছি। আমরা একটি বৈশ্বিক গাইডলাইন করার চেষ্টা করছি, যেটি সারা বিশ্বের অন্তঃসত্ত্বা নারীদের কাজে লাগবে। আমি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছি। আশা করছি ২০২৭ সালের প্রথম দিকে গাইডলাইন প্রকাশ করতে পারব।

৫৯% খোলা ভোজ্য তেলে ভিটামিন ‘এ’ নেই : আজ বিশ্ব পুষ্টি দিবস। দিবসটি উপলক্ষে প্রজ্ঞা গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে ভোজ্য তেলের পুষ্টি সুরক্ষার আহ্বান জানিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাজারে যেসব বোতলে ভোজ্য তেল বিক্রি হয়, তার বেশিরভাগই স্বচ্ছ। ফলে সূর্যালোক এবং সাধারণ বাল্বের আলোর সংস্পর্শে এসে তেলের ভিটামিন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। অন্যদিকে, ড্রামে বাজারজাতকৃত ৫৯ শতাংশ খোলা ভোজ্য তেলে ভিটামিন ‘এ’ নেই বলে আইসিডিডিআর,বির গবেষণায় উঠে এসেছে। ভোজ্য তেলে অণুপুষ্টি বজায় রাখতে আলো প্রতিরোধী অস্বচ্ছ প্যাকেজিং যেমন পাউচপ্যাক, লেমিনেটেড পিইটি বোতল, এইচডিপিই জার, ইউভি দ্রব্যমিশ্রিত বোতল ব্যবহার করা যায়। অস্বচ্ছ বোতল বাইরের আলোক রশ্মিকে আটকে দেয় এবং তেলের পুষ্টিগুণ অক্ষুণœ রাখতে সাহায্য করে। এ ধরনের প্যাকেজিং অতিবেগুনি রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে তেলকে রক্ষা করে। এতে তেলের ভেতরে থাকা ভিটামিন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুলো দীর্ঘসময় ভালো থাকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত