রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল গতকাল বৃহস্পতিবারও বন্ধ ছিল। পরিচালকসহ চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউই হাসপাতালে জাননি। হাসপাতালের মূল ফটকে ছিল তালা। জুলাই আন্দোলনে আহতরা ছাড়া হাসপাতালে কোনো রোগীও ছিল না। কিছু রোগী চিকিৎসা নিতে এসে হাসপাতাল বন্ধ দেখে চলে গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা বলেছেন, নিরাপত্তার অভাবে তারা কেউই হাসপাতালে যাননি। গত বুধবার জুলাই আন্দোলনে আহতরা যেভাবে তাদের ওপর হামলা চালিয়েছেন, তাতে তারা আর হাসপাতালে যাওয়ার সাহস পাচ্ছেন না।
এমনকি এই পরিস্থিতির সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তারা সেবা দেবেন না বলেও জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. জানে আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাসপাতাল বন্ধ, কোনো কার্যক্রম চলছে না। হাসপাতালে কোনো ভর্তি রোগীও নেই। চিকিৎসক-নার্স কেউই জাননি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
গত বুধবার ঢাকার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের কর্মচারীদের সঙ্গে জুলাই যোদ্ধাদের সংঘর্ষ হয়। এ সময় জুলাই যোদ্ধাদের হামলায় ১৫ চিকিৎসক নার্স কর্মকর্তা আহত হন। তাদের মধ্যে চার চিকিৎসক ও এক কর্মচারীর আঘাত মারাত্মক ছিল। একপর্যায়ে হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হাসপাতাল ত্যাগ করেন। পাশাপাশি ভয়ে ও আতঙ্কে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীরাও হাসপাতাল থেকে চলে যায়।
গত বুধবার রাতে হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. জানে আলম দেশ রূপান্তরকে জানান, হাসপাতাল বন্ধ। সেখানে চিকিৎসক ও নার্স কেউ নেই। তালাবদ্ধ। হাসপাতাল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অধীনে।
এরপর বুধবার রাতে অবশ্য হাসপাতাল পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল খায়ের চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেছিলেন, আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা চলছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় আবার সভা হওয়ার কথা ছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, জুলাই ছাত্র আন্দোলনের নেতা ও ছাত্র প্রতিনিধিরা সবাই চেষ্টা করছেন। কিন্তু গতকালও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। হাসপাতাল চালু হয়নি। বন্ধ ছিল সব ধরনের সেবা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক কর্মচারী বলেন, ‘এই আহত যোদ্ধাদের ১১ মাস ধরে আমরা সেবা দিচ্ছি। তাদের ভালোমন্দ দেখছি। তাদের সঙ্গে আছি। অথচ তারা বুধবার আমাদের মেরেছেন, এমনকি এর আগেও তারা আমাদের বিভিন্ন কর্মচারী ও নার্স, ডাক্তারদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছেন। গণ্ডগোলের সময় তাদের সঙ্গে পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতরাও যোগ দেন। এই পরিস্থিতির সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আমরা কাজে যোগ দেব না।’
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে : উন্নত চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগ তুলে গত রবিবার হাসপাতাল পরিচালকের সঙ্গে জুলাই ফাউন্ডেশননের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার বৈঠক চলাকালে চক্ষুবিজ্ঞান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন চার জুলাই যোদ্ধা বিষপান করেন। সঙ্গে সঙ্গে তাদের শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয় ও তারা সুস্থ হয়ে ওঠেন। পরে গত মঙ্গলবার ওই চারজনসহ চক্ষুবিজ্ঞান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অন্য সহযোদ্ধাদের নিয়ে দুপুরে হাসপাতালের পরিচালককে অবরুদ্ধ করেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা বাদে সেনাবাহিনীর সহায়তায় অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্তি পান হাসপাতাল পরিচালক। এর মধ্যে আন্দোলনকারীদের কেউ কেউ গায়ে কেরোসিন-পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
পরিচালককে অবরুদ্ধ করে রাখা এবং আহতদের আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনায় নিরাপত্তার দাবিতে গত বুধবার সকাল থেকে কর্মবিরতি পালন করছিলেন হাসপাতাল কর্মচারীরা। এ অবস্থায় হাসপাতালের কর্মচারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন জুলাই যোদ্ধারা। পরে আহতদের সঙ্গে যোগ দেন পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত যোদ্ধারাও। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তালা মেরে হাসপাতাল ত্যাগ করেন ডাক্তার, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সেই থেকে হাসপাতাল বন্ধ।
