ক্রমবর্ধমান শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে অন্তত এক লাখ শ্রমিক নিয়োগের কথা জানিয়েছে জাপানি কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত উন্নয়নে সহযোগিতা জোরদারের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)।
গতকাল বৃহস্পতিবার টোকিওতে ‘বাংলাদেশ সেমিনার অন হিউম্যান রিসোর্সেস’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘জাপানে বাংলাদেশিদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে অন্তর্বর্তী সরকার প্রয়োজনীয় সবকিছু করবে।’ তিনি বলেন, ‘এটা আমার জন্য সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ও প্রেরণার দিন। এটি শুধু কাজ করার জন্য নয়, বরং জাপানকে জানারও দ্বার উন্মোচন করবে বাংলাদেশের মানুষের জন্য।’
সেমিনারে প্রধান উপদেষ্টা দুটি সমঝোতা স্মারকের সাক্ষী হন। প্রথমটি বাংলাদেশের ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং (বিএমইটি) ও কাইকম ড্রিম স্ট্রিট (কেডিএস)-এর মধ্যে, যার একটি জাপান-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগ; দ্বিতীয়টি বিএমইটি ও জাপানের ন্যাশনাল বিজনেস সাপোর্ট কম্বাইন্ড কো-অপারেটিভস (জাপানে ৬৫টির বেশি কোম্পানির একটি ফেডারেশন) এবং জেবিবিআরএর (জাপান বাংলা ব্রিজ রিক্রুটিং এজেন্সি) মধ্যে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘এ অনুষ্ঠানটি একটি দ্বার উন্মোচনের প্রতীক।’ তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ ১৮ কোটি মানুষের দেশ, যার অর্ধেকই ২৭ বছরের নিচে। সরকারের কাজ হলো তাদের জন্য দরজা খুলে দেওয়া।
শিজুওকার কর্মপরিবেশ উন্নয়ন সমবায়ের তত্ত্বাবধায়ক সংস্থার প্রতিনিধি পরিচালক মিতসুরু মাতসুশিতা বলেন, ‘অনেক জাপানি কোম্পানি বাংলাদেশিদের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করছে এবং তিনি বিশ্বাস করেন যে, এ ধারা অব্যাহত থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশি মেধাবীদের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের প্রতিভা লালন করা আমাদের দায়িত্ব।’
এনবিসিসি চেয়ারম্যান মিকিও কেসাগায়ামা স্মরণ করেন যে, প্রায় ১৪ বছর আগে অধ্যাপক ইউনূস জাপানে এসেছিলেন এবং ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে নারীদের সহায়তার গল্প বলেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের ফেডারেশন তরুণ ও দক্ষ শ্রমিকের জন্য বাংলাদেশকে একটি সম্ভাবনাময় উৎস হিসেবে দেখছে। তারা উভয় দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে আমরা এক লাখ বাংলাদেশি শ্রমিককে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত।’
ওয়াতামি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট মিকি ওয়াতানাবে জানান, বাংলাদেশে তাদের প্রতিষ্ঠিত একটি স্কুল প্রতি বছর ১ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দেয় এবং তারা এই সংখ্যা তিন হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষা গ্রহণকারীরা জাপানের চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে পারবে।’
জাপান ইন্টারন্যাশনাল ট্রেইনি অ্যান্ড স্কিল্ড ওয়ার্কার কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (জেইটিসিও) চেয়ারম্যান হিরোআকি ইয়াগি জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখনো ভাষা শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে।
জাপানের স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের (এমএইচএলডব্লিউ) প্রতিমন্ত্রী নিকি হিরোবুমি বলেন, ‘জাপানে জনসংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে এবং সে কারণে বাংলাদেশি শ্রমিকদের সহায়তা প্রয়োজন হবে। এটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, জাপানের জন্যও একটি আশাব্যঞ্জক দিক হতে পারে।’
স্বাগত বক্তব্যে জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী বলেন, ২০৪০ সালের মধ্যে জাপানে শ্রমিক সংকট ১ কোটি ১০ লাখ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশ এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে আরও দক্ষ শ্রমিক পাঠাতে পারে।
বাংলাদেশ ও জাপান একসঙ্গে কাজ করে বিশ্বের ভাগ্যও পুনর্লিখন করতে পারে: বিশ্ব বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে নিক্কেই ফোরামের উদ্বোধনী অধিবেশনের মূল বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক আস্থা হুমকির মুখে। জাতির মধ্যে, সমাজের অভ্যন্তরে, এমনকি নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও আস্থা হ্রাস পাচ্ছে।
জাপানের টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে অনুষ্ঠিত ৩০তম নিক্কেই ফোরাম ‘ফিউচার অব এশিয়া’র উদ্বোধনী অধিবেশনের মূল বক্তব্যে গতকাল তিনি এসব কথা বলেন।
‘উত্তাল বিশ্বে এশিয়ার চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক বক্তব্যে অধ্যাপক ইউনূস আরও বলেন, ‘বিশ্ব ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে। আমরা এক গভীর অনিশ্চিত সময় পার করছি। আমরা এমন একটি বিশ্বকে প্রত্যক্ষ করছি, যেখানে শান্তি বিনষ্ট হচ্ছে, উত্তেজনা বাড়ছে এবং পারস্পরিক সহযোগিতা সবসময় নিশ্চিত থাকছে না।’
তিনি বলেন, ‘এশিয়ার ভবিষ্যৎ এখনো লেখা হয়নি, আমরাই তা একসঙ্গে লিখব। বাংলাদেশ ও জাপান একসঙ্গে কাজ করে এশিয়ার ভাগ্য এমনকি বিশ্বের ভাগ্যও পুনর্লিখন করতে পারে।’
প্রধান উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, এশিয়া ও তার বাইরের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে এবং শান্তি দিন দিন অধরা হয়ে উঠছে। ইউক্রেন, গাজা এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে যুদ্ধ ও মানবসৃষ্ট সংঘাত হাজারো মানুষের জীবন ও জীবিকা ধ্বংস করে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ এক নির্মম রূপ নিয়েছে এবং সাম্প্রতিক ভূমিকম্প দেশটির গভীর মানবিক সংকটকে আরও অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে।’
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘সম্প্রতি আমাদের দুই প্রতিবেশীর মধ্যে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু ব্যয়বহুল যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। অত্যন্ত দুঃখজনক যে, আমরা কোটি কোটি টাকা যুদ্ধের পেছনে ব্যয় করছি, অথচ লাখ লাখ মানুষ না খেয়ে বা ন্যূনতম চাহিদার জন্য লড়াই করছে।’ তিনি যুদ্ধবিরতির জন্য উভয় দেশের নেতাদের ধন্যবাদ জানান এবং দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সহাবস্থানের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, অন্যদিকে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অনেক প্রতিশ্রুতি দিলেও নতুন নতুন নৈতিক প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ বেড়ে যাওয়ায় মুক্তবাণিজ্য ব্যবস্থার ভিত্তি চ্যালেঞ্জের মুখে এবং আর্থিক বৈষম্য সমাজে বেড়েই চলেছে।
সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ায় এমন বিভাজনের কারণে অসন্তোষ ও অস্থিরতা দেখা গেছে, যা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ডেকে এনেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশে শাসনব্যবস্থার সাম্প্রতিক পরিবর্তন প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, ‘গত বছর শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশে একটি পরিবর্তন ঘটেছে এবং এরপর তার সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। আমরা আমাদের জনগণের স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা পূরণে, ন্যায়বিচার, সমতা, স্বাধীনতা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ রূপান্তরের লক্ষ্যে কাজ করছি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, এটি আমাদের ভুলগুলো সংশোধন করার, নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার সুযোগ।’
বহুমুখী অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও অধ্যাপক ইউনূস বলেন, বাংলাদেশ বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখছে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা মিশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে এবং মানবিক কারণে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে।
তিনি বলেন, ‘বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি মানুষের আবাসস্থল এশিয়া অনিশ্চয়তার কেন্দ্রস্থলে, একই সঙ্গে সম্ভাবনারও কেন্দ্রে।’
‘আমাদের চ্যালেঞ্জগুলো বিশাল, কিন্তু আমাদের সম্মিলিত শক্তিও বিশাল। এ বাস্তবতায়, আমি বিশ্বাস করি এশিয়ার সামনে একটি সুযোগ, এমনকি একটি দায়িত্ব রয়েছে ভিন্ন পথ দেখানোর শান্তির, সংলাপের, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের। শুধু সংখ্যাগত নয়, মানুষের কল্যাণ, আস্থা ও আশার উন্নয়ন’ যোগ করেন তিনি।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘আমরা এ চ্যালেঞ্জগুলোর মুখে অসহায় নই। বরং আমরা ইতিহাসের একটি সন্ধিক্ষণে আছি। আজকের সিদ্ধান্তগুলো নির্ধারণ করবে আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য কেমন পৃথিবী রেখে যাব। তাই আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, কেবল সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্য নয়, বরং সমাধান খুঁজে পেতে। এ সমাধানগুলো যেন অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায্য এবং মানবিকতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে।’
প্রধান উপদেষ্টা প্রায়ই উল্লেখ করা নিজের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘অর্থ উপার্জন আনন্দের বিষয়। কিন্তু মানুষকে সুখী করা, সেটিই প্রকৃত আনন্দ। আমাদের মনোযোগ সরাতে হবে, ব্যক্তিগত মুনাফা থেকে সমষ্টিগত কল্যাণে। স্বল্পমেয়াদি অর্জন থেকে দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্নের দিকে।’ তিনি জানান, তার নিজের জীবনের যাত্রায় গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা থেকে শুরু করে দরিদ্র নারীদের ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া এবং সারা বিশ্বে সামাজিক ব্যবসার ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া পর্যন্ত, তিনি একটি বিষয় স্পষ্টভাবে শিখেছেন; মানুষ কষ্ট পাওয়ার জন্য জন্মায়নি। ‘মানুষ সীমাহীন সম্ভাবনা নিয়ে জন্মায়। আমাদের শুধু তাদের সঠিক সুযোগটি দিতে হবে’ বলেন তিনি।
‘তিনটি শূন্য’ শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব, শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ এ তত্ত্ব উপস্থাপন করে ড. ইউনূস বলেন, ‘এটি কোনো স্বপ্ন নয়, বরং একটি দিকনির্দেশনা।’ ‘যেখানে একটি লক্ষ্যে সরকার, ব্যবসা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং ব্যক্তি একযোগে কাজ করতে পারে’ তিনি বলেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের প্রয়োজন এমন একটি নতুন ধরনের অর্থনীতি, যা প্রতিযোগিতার ওপর নয়, সহানুভূতির ভিত্তিতে গড়ে উঠবে। শুধু ভোগের ওপর নয়, অন্যের কল্যাণ হয় এমন অর্থনীতি হবে। এখানেই আমাদের ভবিষ্যৎ।’
নিক্কেই ফোরাম সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ফিউচার অব এশিয়া’ একটি আশাবাদের মঞ্চ। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘নিক্কেই এমন একটি পরিসর তৈরি করেছে যেখানে সংলাপ সমাধানে রূপ নেয় এবং যেখানে আস্থা কেবল একটি শব্দ নয়, বরং একটি লক্ষ্য, যার দিকে আমরা একসঙ্গে এগিয়ে যাই।’
তিনি বলেন, ‘এশিয়ার ভবিষ্যৎ শুধু অর্থনীতি বা ভূরাজনীতির বিষয় নয়, এটি মানুষের, ভাবনার এবং সাহসের বিষয়। চলুন, আমাদের চারপাশের অস্থিরতা দেখে ভীত না হয়ে এটিকে একটি আহ্বান হিসেবে নিই, নতুন করে ভাবার, পুনর্গঠনের এবং একসঙ্গে জাগরণের আহ্বান।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘ভয়ের দ্বারা নয়, সম্ভাবনার দ্বারা; শক্তির দ্বারা নয়, উদ্দেশ্যের দ্বারা পরিচালিত হই। চলুন, একটি উত্তম বিশ্বের কল্পনা করতে সাহসী হই। চলুন, একে অন্যের প্রতি আস্থা রাখি। চলুন, শুধু প্রয়োজনীয়তার কারণে নয়, বরং আন্তরিক ইচ্ছে থেকে একে অন্যকে সহযোগিতা করি।’
মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত উন্নয়নে জাইকাকে সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার : মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত উন্নয়ন উদ্যোগে (এমআইডিআই) সমর্থন জোরদার করার জন্য জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন অধ্যাপক ইউনূস। যাতে অঞ্চলটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।
টেকিওতে ‘৩০তম নিক্কেই ফোরাম: এশিয়ার ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক সম্মেলনের ফাঁকে জাইকা প্রেসিডেন্ট ড. তানাকা আকিহিকোর সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি এ আহ্বান জানান।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘এমআইডিআই অঞ্চল ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে। বঙ্গোপসাগরের প্রবেশাধিকারকে কাজে লাগিয়ে আমরা গভীর সমুদ্রবন্দর, মহাসড়ক এবং রেলপথ তৈরি করছি, যা এমআইডিআই অঞ্চলকে নেপাল, ভুটান এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অংশের সঙ্গে যুক্ত করবে।’
জাইকা প্রথমে মাতারবাড়ীতে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রস্তাব দেয়। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বর্তমানে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করছে, যার মাধ্যমে পুরো এমআইডিআই অঞ্চলকে একটি বন্দর, লজিস্টিকস, মৎস্য, জ্বালানি ও বিদ্যুৎকেন্দ্রিক হাবে রূপান্তরিত করা হবে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের স্বপ্ন হলো এ অঞ্চলে একটি মেগাসিটি গড়ে তোলা।’ তিনি উল্লেখ করেন যে, বিমানবন্দরগুলোও যাত্রী চাহিদা মেটাতে উন্নত করা হচ্ছে।
ড. তানাকা এমআইডিআই উন্নয়নের ক্ষেত্রে জাইকার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন, তবে তিনি প্রকল্প বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। উত্তরে ড. ইউনূস এমআইডিআই প্রকল্প তদারকির জন্য একজন সিনিয়র কর্মকর্তা নিয়োগ এবং জাইকা ও অন্যান্য সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সমন্বয়ের ঘোষণা দেন।
প্রধান উপদেষ্টা আরও জানান, এমআইডিআই এলাকায় মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা রপ্তানিমুখী উৎপাদন কারখানা স্থাপন করতে পারবেন। এ ছাড়া সরকার এই অঞ্চলে একটি একচেটিয়া মৎস্য অঞ্চল তৈরির পরিকল্পনা করছে, যাতে বড় মৎস্য জাহাজগুলো কার্যক্রম চালাতে পারে।
অধ্যাপক ইউনূস ব্যাখ্যা করেন, ‘আমাদের গভীর সমুদ্র মৎস্য আহরণে যুক্ত হতে হবে। বর্তমানে প্রতিবেশী দেশগুলোর মৎস্যজাহাজ আমাদের জলসীমা ব্যবহার করে, অথচ আমাদের ট্রলারগুলো গভীর সমুদ্রে চালানোর জন্য যথেষ্ট বড় নয়। আমরা যদি সক্ষমতা তৈরি করি তাহলে সেই মাছগুলো প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ করা যাবে।’
ড. তানাকা মন্তব্য করেন, সম্ভবত এই প্রথম তিনি কোনো বাংলাদেশি নেতার মুখে গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণের উদ্যোগ সম্পর্কে শুনলেন।
উভয় নেতা জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সংস্কার কর্মসূচি, দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্নীতিবিরোধী প্রচেষ্টা সম্পর্কেও আলোচনা করেন।
অধ্যাপক ইউনূস নিশ্চিত করেন যে, ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, যার পর একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে তিনি তার আগের কাজে ফিরে যাবেন। এ ছাড়া, রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা হয়, এ ক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টা মানবিক সহায়তা বৃদ্ধিতে জাইকার সমর্থন কামনা করেন। ড. তানাকা রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় জাইকা অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেন।
মাহাথির মোহাম্মদের শততম জন্মদিনে আগাম শুভেচ্ছা প্রধান উপদেষ্টার : মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ আগামী ১০ জুলাই ১০০ বছরে পদার্পণ করবেন। জাপানে মাহাথির সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাতে তার শততম জন্মদিন উপলক্ষে অগ্রিম শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
নিক্কেই ফোরাম ‘ফিউচার অব এশিয়া’ সম্মেলনের ফাঁকে মাহাথির প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাতে তাদের দীর্ঘকালের বন্ধুত্বের স্মৃতিচারণ করেন। মাহাথিরকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি আপনাকে শততম জন্মদিনের অগ্রিম শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।’ মাহাথির মোহাম্মদ ১৯৮১ থেকে ২০০৩ এবং পরে ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
৪০ মিনিটব্যাপী আলোচনায় তারা পারস্পরিক আগ্রহের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন, যার মধ্যে ছিল বাংলাদেশের আসিয়ান সদস্য হওয়ার আকাক্সক্ষা এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন। বাংলাদেশ কয়েক বছর আগে আসিয়ানের খাতভিত্তিক সংলাপের সহযোগী সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন করেছিল, যাতে ভবিষ্যতে পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করা যায়। বর্তমানে মালয়েশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় এ জোটের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে।
প্রধান উপদেষ্টা মাহাথিরকে বলেন, ‘আমাদের আসিয়ান সদস্য হতে মালয়েশিয়ার সমর্থন প্রয়োজন।’ মাহাথির মোহাম্মদ তার শাসনামলে আসিয়ানকে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞ, কারণ দেশটি বিভিন্ন খাতে লাখ লাখ বাংলাদেশিকে কর্মসংস্থানের সুযোগ দিয়েছে।
মাহাথির বলেন, অনেক বাংলাদেশি মালয়েশিয়ায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন এবং উদ্যোক্তা হিসেবে সফল হচ্ছেন। তিনি স্মরণ করেন, কীভাবে তার ‘লুক ইস্ট’ নীতির কারণে মালয়েশিয়া সমৃদ্ধ হয়েছিল এবং বাংলাদেশকেও অনুরূপ নীতি গ্রহণের পরামর্শ দেন।
প্রধান উপদেষ্টা জানান, বাংলাদেশও মালয়েশিয়ার প্রতিবেশী দেশ ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এ সময় ড. ইউনূস মাহাথিরকে অনুরোধ করেন, তিনি যেন তার প্রভাব খাটিয়ে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সহায়তা করেন। তিনি মাহাথিরকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণও জানান।
মাহাথির বলেন, যদি তার চিকিৎসকরা অনুমতি দেন তাহলে তিনি এ আমন্ত্রণ গ্রহণ করবেন। চিকিৎসকরা মাহাথিরের শারীরিক অবস্থার কারণে তার ভ্রমণ সীমিত রেখেছেন।
