কেয়ামতে পাপীদের বিরুদ্ধে চার সাক্ষী

আপডেট : ৩১ মে ২০২৫, ০৩:১০ এএম

মানুষ আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। মানুষকে জ্ঞান, বিবেক, বুদ্ধি ও স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়ে আলাদা মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এই মর্যাদার সঙ্গে এসেছে দায়িত্বও। কিন্তু সেই দায়িত্বশীলতা রক্ষায় মানুষ কতটা সচেতন? নফসের তাড়না, শয়তানের ধোঁকা ও দুনিয়ার মোহে পড়ে মানুষ বহুবার পথচ্যুত হয়। ভুলে যায়, এই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব দিতে হবে এক চূড়ান্ত দিনে, যে দিনকে বলা হয় কেয়ামত বা বিচার দিবস। মানুষ হয়তো গোপনে পাপ করে, ভাবে কেউ দেখছে না, কোনো প্রমাণ নেই, কোনো সাক্ষী নেই। কিন্তু কোরআন ও হাদিসের আলোকে জানা যায়, পাপ যত গোপনে হোক না কেন, তা থেকে নিস্তার নেই। কারণ পরকালে সেই গোপন পাপের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে জমিন, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, ফেরেশতা ও আমলনামা।

আধুনিক বিজ্ঞান যখন সর্বত্র নজরদারির ক্যামেরা, তথ্যভাণ্ডার ও ডিজিটাল প্রমাণের যুগে প্রবেশ করেছে, তখন এক খোদাভীরু মুমিনের হৃদয়ে সাড়া জাগায় সেই পরকালীন সাক্ষ্যের ভয়। যে জমিনের ওপর পা রেখেছি, যে হাত দিয়ে কোনো অন্যায় করেছি, যে চোখ দিয়ে হারাম দেখেছি, সেই সবই কেয়ামতের দিন আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে! ফেরেশতা কোনো মুহূর্তেও আমল রেকর্ড করা থেকে বিরত থাকেন না। শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও মুখ খুলবে সেদিন।

এই ভয়াবহ সত্য যখন সামনে আসে, তখন হৃদয় শিউরে ওঠে। কিন্তু ইসলাম কেবল ভয়ের ধর্ম নয়, এটি আশার ও মুক্তির পথও দেখায়। আল্লাহ রহমান ও রাহিম, যিনি পাপী বান্দার তওবা গ্রহণে সর্বদা প্রস্তুত। তাই যারা ভুল করে পাপে লিপ্ত হয়, তাদের জন্য মুক্তির দরজা সবসময় খোলা, তবে তা হতে হবে আন্তরিক তওবার মাধ্যমে। কোরআন-হাদিসের আলোকে এ লেখায় আলোচিত হয়েছে সেই চার সাক্ষীর পরিচয়, সাক্ষ্য প্রদানের বাস্তবতা এবং একমাত্র মুক্তির পথ সত্যিকারের তওবা সম্পর্কে।

প্রথম সাক্ষী জমিন : মানুষের দ্বারা যেই জমিনের ওপর গুনাহ সংঘটিত হয় সেই জমিনে ওই গুনাহের সাক্ষী হয়ে যায়। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘সেদিন (কেয়ামতের) জমিন তার খবরসমূহ বর্ণনা করে দেবে।’ (সুরা জিলজাল ৪) রাসুল (সা.) সাহাবায়ে কেরামের সম্মুখে এই আয়াতের ব্যাখ্যা এভাবে করেছেন যে, জমিনের ওপর কোনো কাজ করা হয় জমিন সেটার সাক্ষ্য প্রদান করবে। (তাফসিরে মাজহারি ১০/৩২)

দ্বিতীয় সাক্ষী দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ : হাশরের মাঠে পাপীদের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত হবে তার ওই সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যার দ্বারা গুনাহ সংঘটিত হয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আজ আমি তাদের মুখে মোহর লাগিয়ে দেব। ফলে তাদের হাত আমার সঙ্গে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে।’ (সুরা ইয়াসিন ৬৫) এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মানুষের যেসব অঙ্গ-প্রতঙ্গের দ্বারা গুনাহ হয়েছে, কেয়ামতের দিন সেসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করবে। হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) বলেন, সর্বপ্রথম ডান উরু সাক্ষ্য প্রদান করবে। (তাফসিরে ইবনে কাসির)

তৃতীয় সাক্ষী ফেরেশতা : প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে সর্বদা দুজন ফেরেশতা নিয়োজিত থাকেন। তারা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যাবতীয় আমল সংরক্ষণ করে রাখেন। তাদের একজন লিখে রাখেন নেক আমল, আর অপরজন সংরক্ষণ করেন বদ আমল। কারও কোনো আমলই তাদের অজানা থাকে না। কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘সম্মানিত লেখকবৃন্দ (ফেরেশতারা), তারা জানে তোমরা যা করো। (সুরা ইনফিতার ১১-১২)

চতুর্থ সাক্ষী আমলনামা : ফেরেশতারা যে আমলনামায় মানুষের যাবতীয় আমল লেখেন সেটিও তাদের জন্য সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত হবে। এ বিষয়ে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘যখন আমলনামা উন্মুক্ত হবে, ৃতখন প্রত্যকেই জেনে নেবে সে কী উপস্থিত করেছে।’ (সুরা তাকবির ১০-১৪)

মুক্তির উপায় : এখন প্রশ্ন হয়, যেহেতু কেয়ামতের দিন আমাদের বিরুদ্ধে চারটি সাক্ষী পেশ করা হবে, তাহলে আমরা মুক্তির জন্য কী পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারি? যারা নিজেদের জীবনের উপর জুলুম করেছে এবং নিজেই নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দাঁড় করিয়েছে, তাদের জন্য এমন কোনো উপায় আছে কি? যাতে কেয়ামতের দিন তাদের এ সাক্ষী ও সাক্ষ্য পেশ না হয়, বরং তা নিঃশেষ হয়ে যায়। রাসুল (সা.) উম্মতের জন্য সেই পন্থাও বলে দিয়েছেন। তা হলো তওবা করা। অবশ্য এই তওবা হতে হবে তওবার শর্তাবলি সহকারে।

শর্তাবলি হলো, গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে যাওয়া। গুনাহের জন্য অনুশোচনা পোষণ করা। অনুতপ্ত হওয়া। ভবিষ্যতে আর গুনাহে লিপ্ত না হওয়ার প্রতিজ্ঞা করা। পরিপূর্ণ এই নিয়ত করবে যে, হে আল্লাহ! আর কখনো এমন গুনাহ করব না। অন্তর দিয়ে এই প্রতিজ্ঞা করা যে, যদি প্রাণও বের হয়ে যায় তবুও কখনো এই গুনাহের কাছে যাব না।

ইসলাম কেবল ভয় বা শাস্তির বার্তাই দেয় না, বরং মুক্তিরও পথ দেখায়। আল্লাহর দরজা খোলা থাকে সব সময়, বিশেষত সেই বান্দার জন্য, যে সত্যিকার তওবার মাধ্যমে নিজের গুনাহের জন্য অনুশোচনা করে।

সুতরাং একজন মুসলিমের জন্য স্পষ্ট বার্তা হলো, আজই নিজের জীবন পর্যালোচনা করুন, গুনাহের পথ থেকে ফিরে আসুন, তওবা করুন আল্লাহর দরবারে। কারণ যতদিন প্রাণ আছে, ততদিন আল্লাহর রহমতের দরজা খোলা। কিন্তু কেয়ামতের দিন যখন জমিন, অঙ্গ, ফেরেশতা ও আমলনামা সাক্ষ্য দিতে শুরু করবে, তখন আর কিছুই করার থাকবে না। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই ভয়াবহ দিনের সাক্ষ্য থেকে মুক্তি দিয়ে নাজাতপ্রাপ্তদের কাতারে শামিল করুন। আমিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত