মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর অধীনে বিদ্যালয়ের ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানের প্রকল্পে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষকদের বেতন ও কেন্দ্রের ঘরভাড়া আত্মসাৎ, প্রয়োজনীয় উপকরণ না দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়া, বন্ধ কেন্দ্রের নামে টাকা উত্তোলনসহ নানা অভিযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নকারী এনজিও পিপলস অ্যাডভান্সমেন্ট সোশ্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (পাশা) নির্বাহী পরিচালক ফরিদ খানের বিরুদ্ধে।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনতে আউট অব স্কুল চিলড্রেন এডুকেশন নামের প্রকল্পে প্রত্যেক কেন্দ্রে ৮-১৪ বছরের ২০-৩০ জন শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন ৩ ঘণ্টা করে সপ্তাহে ছয়দিন পাঠদান দেওয়ার কথা ছিল। ২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর হরিরামপুর উপজেলায় ৬১টি শিখন কেন্দ্রের উদ্বোধন করা হয়।
প্রকল্পের কয়েকজন শিক্ষক, সুপারভাইজার, কেন্দ্রের ঘর মালিক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিটি কেন্দ্রের জন্য ফ্যান, লাইট, পানির জার, হাতলওয়ালা চেয়ার, ট্রাংক, বসার মাদুর, তথ্য চার্ট, রেজিস্টার খাতা, খেলার সামগ্রী, শিক্ষার্থীদের আইডি কার্ড দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নিম্নমানের ফ্যান, লাইট, চেয়ার ও মাদুর, রেজিস্টার খাতা দেওয়া হলেও বাকিগুলো দেওয়া হয়নি। প্রতি মাসে শিক্ষার্থীদের জন্য তিনটি করে অনুশীলন খাতা, কলম, রঙ পেন্সিল ও চক দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়েছে বছরে ২-৩ বার। শিক্ষক, অভিভাবক ও সিএমসি সভার জন্য বরাদ্দের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। প্রতি শিক্ষার্থীর জন্য ১২০০ টাকা মূল্যের স্কুলব্যাগ দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়েছে ৩০০-৪০০ টাকার নিম্নমানের ব্যাগ। জুতা দেওয়ার কথা বলা হলেও তা দেওয়া হয়নি। কেন্দ্র ভাড়া ১৫০০ টাকার মধ্যে ১২০০ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। জেলার সহকারী পরিচালক মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যাওয়ার সময়ে সব শিক্ষক ও সুপারভাইজারদের দুই মাসের বেতন কাটা হয়। এছাড়া, পিকনিকের জন্য সবার এক মাসের বেতন কাটা হয়। এসব অনিয়ম-দুর্নীতিতে কোটি টাকা লুটে নিয়েছেন পাশা’র নির্বাহী পরিচালক ফরিদ খান।
শালখাই নাসিরুদ্দিন প্রধানের বাড়ির শিক্ষক শারমিন বলেন, ‘গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আমাদের ৬ মাসের বেতন ও ঘরভাড়া বাকি রয়েছে। পিকনিকের জন্য এক মাস এবং এর আগে দুই মাসের বেতন কেটে রাখা হয়েছে। প্রতিমাসে খাতা-কলমসহ অন্যান্য উপকরণ দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়েছে বছরে ২-৩ বার। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার জন্য প্রশ্ন দেওয়ার কথা থাকলেও তা আমাদের টাকায় ফটোকপি করে নিতে হয়েছে। এসব কিছু আমরা না পেলেও পেয়েছি মর্মে আমাদের কাছে থেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে।’
নামপ্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষক বলেন, সুপারভাইজার আব্দুর রহমান ও প্রোগ্রাম ম্যানেজার মুস্তাফিজুর রহমানের সহযোগিতায় পাশা’র নির্বাহী পরিচালক ফরিদ খান এই টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
সুপারভাইজার আব্দুর রহমানের মুঠোফোনে কল করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পরে তিনি ‘ব্যস্ত আছি’ বলে কল কেটে দেন।
শিক্ষকদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সুপারভাইজার ইলিয়াস মোর্শেদ বলেন, জেলার সহকারী পরিচালক মাতৃত্বকালীন ছুটিতে গেলে ওইসময় সবার দুই মাসের বেতন কাটা হয়। এছাড়া পিকনিকের জন্য এক মাসের বেতন কাটা হয়েছে। শিক্ষকদের অভিযোগগুলো সত্য বলে স্বীকার করেন তিনি।
আরেক সুপারভাইজার আরিফুর রহমান বলেন, ‘ছয় মাসের বেতন ও ঘর ভাড়ার টাকা বকেয়া আছে। আমাদের জানানো হয়েছে টাকা এখনো ছাড় হয়নি। হলে সবার বেতন ও ঘরভাড়া দেওয়া হবে।’
এসব বিষয়ে পাশা’র নির্বাহী পরিচালক ফরিদ খান বলেন, ‘যেসব উপকরণ দেওয়া হয়নি সেগুলোর কোনো বিল-ভাউচার হবে না। সরকারের বরাদ্দ যখন আসবে, তখন বেতন পাবে। সরকারের বরাদ্দ আসেনি। এজন্য বেতনও পরিশোধ করা হয়নি।’
জেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর সহকারী পরিচালক রুকাইয়া জান্নাত বলেন, ‘আমি একটা ট্রেনিংয়ে আছি। তাই এখন কোনো কথা এবং বক্তব্য দিতে পারব না।’
