কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ থানার তরুণ খামারি সাদ্দাম হোসেন মাসখানেক আগে ২৭ টাকা পিস হিসেবে ১২০০ ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা তুলেছিলেন শেডে। কিন্তু এই এক মাসের ব্যবধানে বাজারে ব্রয়লার মুরগির বাচ্চার দাম কমে ২-৩ টাকায় নেমেছে। বাচ্চার দাম পড়ে যাওয়ার কারণে ব্রয়লার মুরগির দামও কমে গেছে। এতে করে শঙ্কায় পড়েছেন এই খামারি। কারণ ব্রয়লার মুরগির দাম কমে যাওয়ার কারণে খামারি পর্যায়ে ব্রয়লার মুরগির দাম উৎপাদন খরচের নিচে চলে এসেছে।
সাদ্দাম হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার তিনটি শেডে সাড়ে ৬ হাজার বাচ্চা পালনের সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু বাজারের এই অবস্থায় নিশ্চিত লোকসান জেনেও অল্প পরিসরে খামার চালিয়ে যাচ্ছি। বাজার ভালো না হলে আর বাচ্চা তুলব না শেডে। কারণ এখন আমার উৎপাদন খরচ ১৩০-১৪০ টাকার মধ্যে থাকলেও খামারে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকার নিচে।’
একই অবস্থায় পড়েছেন ওই এলাকায় প্রায় ২০ বছর ধরে খামার পরিচালনায় জড়িত খামারি মোহসেল উদ্দিন। তিনি তার পুরো শেডই বন্ধ রেখেছেন।
এটা খামারির অবস্থা, অন্যদিকে আরও বেকায়দায় পড়েছেন মুরগির বাচ্চা উৎপাদনকারীরা। এক মাস আগে একদিন বয়সী ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা ২৭ টাকায় বিক্রি করতে পেরেছেন। এখন সেটার দাম নেমেছে ২-৫ টাকার মধ্যে। এই অবস্থা চলছে গত ১৫ দিন ধরে। তবে সরকার নির্ধারিত মুরগির বাচ্চার উৎপাদন খরচ ৫৭ টাকা হলেও গত দুই মাস ধরে বাচ্চা উৎপাদনে জড়িত হ্যাচারি মালিকরা উৎপাদন খরচের চেয়ে ১০ টাকা লোকসানে বাচ্চা বিক্রি করতে শুরু করেন, যা এখন ৫ টাকার নিচে নেমেছে। ব্যাপক লোকসানে পড়ছে হ্যাচারিগুলো।
মুরগির বাচ্চা উৎপাদনে জড়িত মালিকদের সংগঠন ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (বিএবি) বলছে, চাহিদার অতিরিক্ত বাচ্চা উৎপাদনের কারণে বাচ্চার দাম একেবারেই পড়ে গেছে। মানুষের আয় কমে যাওয়া, ৫ আগস্টের পর অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে শ্রমিকদের চাকরি হারানোসহ নানা কারণেই ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের চাহিদা ধারাবাহিকভাবে কমেছে। এতে করে লোকসানের ভয়ে খামারিরাও সীমিত পরিসরে ব্রয়লার মুরগি পালন করছেন। অন্যদিকে প্রতিনিয়তই বেড়েছে মুরগির বাচ্চার উৎপাদন। এই অবস্থায় বাচ্চা উৎপাদনকারীরা লোকসান গুনতে গুনতে কিছু কিছু হ্যাচারি বন্ধের পর্যায়ে চলে গেছে।
ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য বলছে, উৎপাদন খরচের তুলনায় গড়ে ১০ টাকা লোকসান ধরে হিসাব করলেও গত দুই মাসে ৭৬৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকার বেশি লোকসান করেছে। তবে বাচ্চা উৎপাদনকারীদের এই ক্ষতির পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে দাবি করছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা।
ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন বলছে, স্বাভাবিক চাহিদা মাথায় রেখে প্রতি সপ্তাহে ব্রয়লার মুরগির বাচ্চার উৎপাদন ১ কোটি ৩০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ হলে সেটাকে স্বাভাবিক বলা হয়। কিন্তু বর্তমানে সপ্তাহে বাচ্চা উৎপাদন হচ্ছে ১ কোটি ৯২ লাখ। অর্থাৎ এখানে চাহিদার চেয়ে বেশি ৪২ লাখ পিস ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা উৎপাদন হচ্ছে। একইভাবে প্রতি সপ্তাহে কালার বার্ডের চাহিদার দ্বিগুণ ৩৬ লাখ বাচ্চা উৎপাদন হচ্ছে। তবে লেয়ার মুরগির বাচ্চার উৎপাদনে কিছুটা সামঞ্জস্য রয়েছে এবং প্রতি সপ্তাহে ১৫ লাখ লেয়ার বাচ্চা উৎপাদন হচ্ছে। তবে চাহিদা কমে যাওয়াও এই স্বাভাবিক উৎপাদনও এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একদিন বয়সি মুরগির বাচ্চা উৎপাদনকারীদের সংগঠন বিএবি-এর তথ্য মতে, এপ্রিল মাসে ব্রয়লার বাচ্চা বিক্রি হয়েছে গড়ে যথাক্রমে ৩০-৪০ টাকা এবং মে মাসে বাচ্চার দাম নেমেছে ৮-১০ টাকায়। অন্যদিকে মে মাসে লেয়ার বাচ্চা বিক্রি হয়েছে গড়ে মাত্র ৪৭ টাকায়, এপ্রিল মাসে কালার বাচ্চা বিক্রি হয়েছে গড়ে মাত্র ২৫-৩৫ টাকায় ও মে মাসে গড়ে ১৫-২০ টাকায়। সবগুলো বাচ্চাই বিক্রি হয়েছে উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম দামে।
ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাচ্চা উৎপাদনকারী থেকে শুরু করে খামারি পর্যায়ে সবাই এখন লোকসানে পড়েছেন। এটা একটা বিপর্যয়। তবে বাচ্চার চাহিদার বেশি উৎপাদন একটি কারণ। অন্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে মানুষের আয় কমে যাওয়ার কারণে চাহিদা কমে যাওয়া। গার্মেন্টস জোনগুলোতে শ্রমিকরা চাকরি হারানোর কারণে ওইসব এলাকাগুলোতে দাম আরও কমেছে। এই অবস্থাগুলো মিলে একটা বড় সংকট তৈরি হয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক খামারিদের একটি কাজী ফার্মস। যারা মুরগির ডিমের উৎপাদনের পাশাপাশি মুরগির বাচ্চার উৎপাদনেও রয়েছে। কাজী ফার্মসের পরিচালক কাজী জাহিন হাসান বলেন, ‘এক দিনের বাচ্চার দাম ব্রয়লার মুরগির দামের ওপর নির্ভর করে। ব্রয়লার মুরগির বাজারদর কম থাকলে খামারিরা বাচ্চা কিনতে চান না, তাই বাচ্চা মুরগির দামও কমে যায়। যখন ব্রয়লারের দাম বেশি থাকে, তখন সব খামারি বাচ্চা কিনতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন, ফলে উৎপাদনের চেয়ে চাহিদা বেড়ে যায় এবং বাচ্চার দামও বৃদ্ধি পায়।’
চাহিদার তুলনায় উৎপাদন অনেক বেশি হওয়ায় এখন ব্রয়লারের দাম কম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে দাম নির্ধারণ হয়ে থাকে। গত বছর এক দিনের বাচ্চার দাম যখন বেশি ছিল হ্যাচারিগুলো বাচ্চার উৎপাদন বাড়ানোর ব্যবস্থা করেছিল, ফলে বর্তমানে বাজারে সরবরাহ বেশি। যদি যোগসাজশ করে উৎপাদন কমিয়ে দাম বাড়ানোর সিন্ডিকেট থাকত তাহলে উৎপাদন কখনো এত বেশি হতো না এবং দামও এত কম হতো না।’
ওয়ার্ল্ড’স পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ শাখার (ওয়াপসা) সভাপতি ও প্যারাগন পোলট্রি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান বলেন, ‘উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে বলা হচ্ছে যে, মুরগির বাচ্চার দাম ব্রয়লার মুরগির দামের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু মহল বিশেষ দাম বৃদ্ধির জন্য অযৌক্তিকভাবে কথিত সিন্ডিকেটের ওপর দায় চাপিয়ে আসছেন। যা এ খাত সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব উসকে দিয়েছে।’ এখন এ খাত প্রকৃত অর্থেই সংকেট রয়েছে। এখান থেকে উত্তরণে সরকারসহ সব মহলের সহযোগিতা দরকার।
