গ্রেটা থুনবার্গকে ছেড়ে দিয়েছে ইসরায়েল

আপডেট : ১১ জুন ২০২৫, ০৪:২৩ এএম

ইসরায়েল জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনরোধী আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গসহ ফিলিস্তিনপন্থি ১২ জন অধিকারকর্মীকে তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। গত সোমবার ভূমধ্যসাগরে ত্রাণবাহী ইয়ট ম্যাডলিন দখলের পর তেল আবিবের সামরিক বাহিনী এই অধিকারকর্মীদের আটক করেছিল। 

বিবিসির খবরে, ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বলা হয়, গ্রেটা থুনবার্গ ইসরায়েল ত্যাগে সম্মত হওয়ার পর গতকাল মঙ্গলবার সকালে ফ্রান্সগামী একটি ফ্লাইটে তাকে তুলে দেওয়া হয়। ফ্রান্স হয়ে তিনি তার নিজ দেশ সুইডেনে ফিরবেন। তবে, একই ইয়ট থেকে আটক ছয় ফ্রেঞ্চ অধিকারকর্মীর মধ্যে পাঁচজনই দেশে ফেরার আদেশনামায় স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেছেন। ফ্রান্সের কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই পাঁচজনকে এখন ইসরায়েলের বিচারিক কর্র্তৃপক্ষের সামনে হাজির করা হবে। 

ম্যাডলিন নামের এই ইয়টটি ইসরায়েলের নৌ-অবরোধ উপেক্ষা করে গাজায় প্রতীকী ত্রাণ পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল। পথিমধ্যে ইসরায়েলি সেনারা ইয়টটি দখল করে নেয়। তেল আবিবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই নৌযানটিকে সেলফি ইয়ট বলে সমালোচনা করে। তারা জানায়, সোমবার রাতে ইয়টের আরোহীদের অ্যাশদোদ বন্দর থেকে তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে স্থানান্তর করা হয়। 

ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে এক পোস্টে বলে, যারা ইসরায়েল ত্যাগের কাগজপত্রে স্বাক্ষর করতে বা দেশ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানাবে, তাদের বিচারিক কর্র্তৃপক্ষের সামনে হাজির করা হবে।

মঙ্গলবার সকালে তারা আরেকটি পোস্টে জানায়, ‘গ্রেটা থুনবার্গ ফ্রান্স হয়ে সুইডেনগামী ফ্লাইটে চেপে ইসরায়েল ত্যাগ করেছেন। পোস্টের সঙ্গে বিমানে বসে থাকা থুনবার্গের একটি ছবিও প্রকাশ করা হয়।

ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো এক্সে একটি পোস্টে বলেন, গত রাতে আমাদের কনস্যুলার কর্মকর্তারা ইসরায়েলি কর্র্তৃপক্ষের হাতে আটক ছয় ফরাসি নাগরিকের সঙ্গে দেখা করেছেন। তাদের মধ্যে একজন স্বেচ্ছায় ইসরায়েল ত্যাগে সম্মত হয়েছেন এবং তিনি আজ ফিরে আসবেন। বাকি পাঁচজন জোরপূর্বক প্রত্যাবাসনের সম্মুখীন হবেন। 

বারো এই ছয় ফ্রেঞ্চ অধিকারকর্মীর নাম প্রকাশ করেননি। তবে, বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, এদের মধ্যে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য রিমা হাসান এবং আল-জাজিরার সাংবাদিক ওমর ফায়াদ রয়েছেন। ম্যাডলিন ইয়টে ফ্রান্স ও সুইডেন ছাড়াও ব্রাজিল, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, স্পেন এবং তুরস্কের নাগরিকরা ছিলেন। 

ইয়টটি পরিচালনাকারী ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন (এফএফসি) সোমবার রাতে এক বিবৃতিতে বলে, যেসব যাত্রী ইসরায়েল ত্যাগে রাজি হবেন না, তাদের তেল আবিবের কাছে রামলে কারাগারে পাঠানো হতে পারে। তারা বলে, আমরা আমাদের সব স্বেচ্ছাসেবকের অবিলম্বে মুক্তি এবং চুরি হওয়া ত্রাণ ফেরত দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। এই স্বেচ্ছাসেবকদের আটক বেআইনি এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। 

এফএফসি জানায়, ইয়টটিতে শিশুখাদ্য, খাবার এবং ওষুধের মতো ত্রাণসামগ্রী ছিল। গাজার মানবিক সংকট নিয়ে প্রচার জোরদার করতে এবং এই ভূখণ্ডে ত্রাণ পৌঁছানোর লক্ষ্যে গত ১ জুন ইয়টটি ইতালি থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। 

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ রবিবার বলেছিলেন, আমি আইডিএফকে নির্দেশ দিয়েছি যেন ম্যাডলিন ফ্লোটিলা গাজায় পৌঁছাতে না পারে।

আটকের পর কাৎজের একজন মুখপাত্র জানান, ইয়টটি অ্যাশদোদ বন্দরে পৌঁছানোর পর অধিকারকর্মীদের ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলার ভিডিও দেখানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। 

ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, এই দলটি ‘মিডিয়া প্রভোকেশন’ তৈরির চেষ্টা করেছে, যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল প্রচার লাভ। তারা বলে, গাজায় সহায়তা পাঠানোর বৈধ উপায় রয়েছে, এর সঙ্গে ইনস্টাগ্রামের সেলফির কোনো সম্পর্ক নেই।

পূর্ববর্তী এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় বলেছিল, অননুমোদিতভাবে অবরোধ ভাঙার চেষ্টা বিপজ্জনক, অবৈধ এবং চলমান মানবিক প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করে।

সিএনএন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন, যারা গাজায় ইসরায়েলের অবরোধের বিরুদ্ধে সরব, তারা ম্যাডলিন ইয়টের মাধ্যমে অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করেছিল। আরোহীরা অনলাইন ট্র্যাকারের মাধ্যমে ইয়টের অবস্থান প্রকাশ করেছিল এবং ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর হাতে আটকের জন্য প্রস্তুত ছিল। 

যুক্তরাজ্যের পতাকাবাহী এই বেসামরিক ইয়টটি সোমবার সকালে মিসরের উত্তরে অবস্থান করছিল এবং ধীরে ধীরে গাজা উপকূলের দিকে এগোচ্ছিল। কিন্তু পরে ট্র্যাকারটি বন্ধ হয়ে যায়। 

শনিবার সিএনএন-এর সঙ্গে কথা বলার সময় গ্রেটা থুনবার্গ বলেছিলেন, আমরা জানি এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ মিশন। এর আগে এ ধরনের জাহাজে আক্রমণ, সহিংসতা এবং এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। 

ইসরায়েল গত মার্চ থেকে গাজায় সব মানবিক সহায়তা বন্ধ করে দিয়েছিল এবং ১১ সপ্তাহ ধরে কোনো সহায়তা প্রবেশ করতে দেয়নি। আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ার পর সম্প্রতি তারা গাজায় সীমিত পরিমাণে সহায়তা প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে, যা যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক কম। 

ত্রাণ সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, গাজার মানবিক সংকট ক্রমশ ভয়াবহ হচ্ছে এবং ব্যাপক দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি বাড়ছে। জাতিসংঘ সমর্থিত একটি প্রতিবেদনে এপ্রিলে বলা হয়, গাজার প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন অনাহারের সম্মুখীন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত