রংপুর সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। গত ১২ জুন রাতে কেন্দ্র থেকে চার কিশোরী নিতু, স্মৃতি, কৃতি ও আশা পালিয়ে যায়।
১৫ জুন পুলিশ স্মৃতি ও কৃতিকে রংপুর নগরীর কাচারিবাজার ও কলেজ রোড থেকে উদ্ধার করলেও নিতু ও আশা এখনো নিখোঁজ। উদ্ধার হওয়া কিশোরীরা কেন্দ্রে নিয়মিত নির্যাতনের ভয়াবহ বিবরণ প্রকাশ করেছে। সমাজসেবা কার্যালয় অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে, যা স্থানীয় সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।
রংপুর নগরীর দেওডোবা ডাংগীরপাড়ে অবস্থিত ১০০ শয্যার এ কেন্দ্রে বর্তমানে ৬৮ জন শিশু-কিশোরী রয়েছে। এরা হারিয়ে যাওয়া, প্রতিবন্ধী, এতিম অথবা আদালতের নির্দেশে প্রেরিত। ২০১৫ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে প্রতিষ্ঠিত এ কেন্দ্রের উদ্দেশ্য ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের নিরাপদ আশ্রয় ও পুনর্বাসন। তবে সাম্প্রতিক ঘটনা এর ব্যর্থতা তুলে ধরেছে।
স্মৃতির মা মুক্তি বেগম অভিযোগ করেন, কেন্দ্রে শিশুদের শারীরিক-মানসিক নির্যাতন, রাতে অজ্ঞাত পুরুষের আনাগোনা এবং নিম্নমানের খাবারের কারণে তার মেয়ের জীবন ঝুঁকিতে। তিনি মেয়েকে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে রাখতে চাইলেও আদালতের নির্দেশে তা সম্ভব হয়নি। তিনি জানান, স্মৃতি নিখোঁজ হওয়ার পর থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে চাইলে সমাজসেবা কর্মকর্তারা বাধা দেন। পরে চাপের মুখে তারা নিজেরাই জিডি করেন।
স্মৃতি (১৭) সাংবাদিকদের বলেছে, ‘প্রতি রবিবার একজন পুরুষ এসে মেয়েদের শরীরে হাত দেয়। এক কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর নির্যাতিত হয়ে এখন নিখোঁজ। আমি প্রতিবাদ করলে গালাগাল করা হতো। জীবন বাঁচাতে পালিয়েছিলাম।’
সে জানায়, নিখোঁজ আশা ও নিতুও নির্যাতনের শিকার। অনেক কিশোরী নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে কান্নাকাটি করে।
স্মৃতির সাক্ষাৎকারের সময় পুনর্বাসন কেন্দ্রের এক নারী কর্মী কৃতিকে মিডিয়া থেকে আড়াল করতে দ্রুত আদালতপাড়া ত্যাগ করার চেষ্টা করেন। গণমাধ্যমের প্রশ্নে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন। তাৎক্ষণিক বক্তব্য নিতে চাইলে কৃতি নির্যাতনের ভয়ে মুখ খোলেনি।
সরেজমিনে দেখা যায়, গণমাধ্যমের পরিচয় দিলেও কেন্দ্রের গেট খুলতে দায়িত্বপ্রাপ্তরা বিলম্ব করেন। পরে গেট খুলে তারা কথা বলেন। নিচতলায় নিবাসীদের সঙ্গে কথা বলার সময় একজন জানান, গত ১২ জুন চার কিশোরী পালিয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা প্রথমে ঘটনা অস্বীকার করলেও গণমাধ্যমের জেরার মুখে স্বীকার করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলেন, কঠোর নিরাপত্তা থাকলেও মাঝেমধ্যে এমন ঘটনা ঘটে। ভবিষ্যতে এমনটি না হওয়ার জন্য বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। এটি পুনর্বাসন কেন্দ্র, সংশোধনাগার নয়। তাই মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনা ঘটে। তারা জানান, ২০২৫ সালে চার শিশু মারা গেলেও একজনের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। বাকিদের ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়।
রংপুর জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক অনিল চন্দ্র বর্মণের সাক্ষাৎকার নিতে গেলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কোনো কথা বলতে চাই না। ক্যামেরা বন্ধ করুন। আমি কিছু বলতে পারব না।’
মানবাধিকার ও পরিবেশ সংগঠনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এএএম মুনীর চৌধুরী বলেন, ‘যে শিশু-কিশোরীদের নিরাপদ আশ্রয় ও দেখভালের দায়িত্ব রাষ্ট্র নিয়েছে, তাদের হারিয়ে যাওয়া বা নির্যাতনের শিকার হওয়া গভীর উদ্বেগের বিষয়। দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। তাই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা এবং নিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমাজসেবা অধিদপ্তর, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং প্রধান উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’
