রোহিঙ্গা সংকট বড় হুমকি আঞ্চলিক নিরাপত্তায়

আপডেট : ২১ জুন ২০২৫, ০৮:০৭ এএম

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, যদি দ্রুত ও কার্যকর সমাধান না হয়, তাহলে এ সংকট শুধু মানবিক নয়; ভবিষ্যতে তা গোটা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকিতে পরিণত হবে।

গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ আয়োজিত ‘আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার ওপর দারিদ্র্য, উন্নয়ন ঘাটতি ও সংঘাতের প্রভাব’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় তিনি এ সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন। যুবসমাজ ও শান্তি উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তৌহিদ হোসেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে তরুণদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলনে তরুণরাই নেতৃত্ব দিয়েছে। শান্তি ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও যুবসমাজের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ।’

বৈঠকে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ : এ বৈঠকে সুইডেন, উরুগুয়ে, পূর্ব তিমুর, জার্মানি ও আরও কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন। তারা বলেন, বিশ্ব জুড়ে সংঘাত, দারিদ্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে এবং এখন সময় একযোগে কাজ করার।

১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয়, চাপ বাড়ছেই : বক্তব্যে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশ গত আট বছরের বেশি সময় ধরে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে মানবিক বিবেচনায় আশ্রয় দিয়েছে। এ জনগোষ্ঠী মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছে।’

তিনি উল্লেখ করেন, সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে এটি এখন বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে। শুধু মানবিক নয়, বরং অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশগত এবং ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। কক্সবাজারের ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে এত বিপুলসংখ্যক শরণার্থী বসবাসের ফলে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ, সম্পদের ওপর চাপ এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে বলে বিশেষজ্ঞ মহল বারবার সতর্ক করে আসছে।

তৌহিদ হোসেন জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বানে বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য সম্মিলিত, কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘তাদের যেন এমন পরিবেশে ফিরিয়ে নেওয়া হয় যেখানে তারা নিরাপদ বোধ করবে এবং মৌলিক অধিকারভিত্তিক জীবনযাপন করতে পারবে।’

বাংলাদেশ এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক ফোরামে বারবার সরব হলেও মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের অনাগ্রহ এবং আন্তর্জাতিক শক্তির কার্যকর চাপের অভাবেই সমস্যার সমাধান থমকে রয়েছে।

বিশ্ব শরণার্থী দিবস: পরিসংখ্যানেই সংকটের ভয়াবহতা

বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ১২ থেকে ১৩ লাখের কাছাকাছি, প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে গড়ে ৯৫টি শিশু, শরণার্থীদের মধ্যে ৫২ থেকে ৫৫ শতাংশ নারী ও শিশু।

এ ছাড়া ২০২৫ সালের মধ্যেই শরণার্থী সংখ্যা ১৩ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অবকাঠামোগত সংকট, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা নিয়ে ক্যাম্পগুলোতে প্রতিনিয়ত জটিলতা বাড়ছে।

বিশ্বব্যাপী উদ্বাস্তু সংকটও বাড়ছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন ইউএএইচসিআর জানায়, ২০২৩ সালের শেষে বিশ্বে ৮ কোটি ৯৩ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত ছিল। তাদের মধ্যে ২ কোটি ৭১ লাখ শরণার্থী, বাকিরা রাষ্ট্রহীন, অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত বা আশ্রয়প্রার্থী।

শরণার্থীদের মধ্যে রয়েছে সিরিয়া থেকে ২৭ শতাংশ, ভেনেজুয়েলা ১৮ শতাংশ, আফগানিস্তান ১১ শতাংশ, দক্ষিণ সুদান ৯শতাংশ এবং মিয়ানমার থেকে ৫ শতাংশ; যা শান্তি, স্থিতি ও উন্নয়নমুখী বিশ^ বসতির জন্য সৃষ্টি করেছে স্থায়ী হুমকি। বিশ্বের প্রায় ৭২ শতাংশ শরণার্থী আশ্রয় পেয়েছে প্রতিবেশী দেশগুলোতে, যা আশ্রয়দাতা দেশগুলোর জন্য বিশাল চাপ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের প্রতিষ্ঠাতা ড. তাসনিম আরেফা সিদ্দিকী বলেন, ‘শরণার্থীদের মানবাধিকার নিশ্চিতে বিশ্ব জুড়ে আরও সংহত রাজনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা শুধু মানবিক সংকটে পড়েনি, তারা সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতেও রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শুধু মানবিক বিবেচনায় নয়, বরং রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত