পবিত্র কোরআন মানব জাতির জন্য পরিপূর্ণ জীবনবিধান। কোরাআনে রয়েছে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো হেদায়েত, শিক্ষা, সতর্কবাণী ও নানা করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা। কোরআনের প্রতিটি আয়াত, প্রতিটি সুরা নিজস্ব তাৎপর্য ও শিক্ষায় সমৃদ্ধ। এর মধ্যে সুরা কাফিরুন সংক্ষিপ্ত ও গভীর তাৎপর্যমণ্ডিত একটি সুরা। এটি যেমন তাওহিদের অকাট্য ঘোষণা বহন করে, তেমনি মুসলমানদের আত্মপরিচয়, আদর্শিক দৃঢ়তা ও বিশ্বাসের ব্যাপারে অবিচল থাকার শিক্ষা দেয়। কোরআনের ১০৯তম সুরা এটি, নাজিল হয়েছে মক্কায়, যখন ইসলামের বিরুদ্ধে কুরাইশ নেতারা নানা ষড়যন্ত্র ও কূটচাল চালাচ্ছিল।
সুরা কাফিরুন মুসলমানদের বিশ্বাসী চেতনাকে জাগ্রত করার এক প্রকার শপথবাক্য। এ সুরার মাধ্যমে মহান আল্লাহ মুসলমানদের শিখিয়ে দিয়েছেন, কুফরি ও তাওহিদের মাঝে কোনো আপস হয় না। কোনো অবস্থাতেই মুসলমান তার আকিদা ও ইবাদতের বিষয়ে সমঝোতা করতে পারে না। সুরাটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, ইসলামের পথে চলতে হলে অন্য কোনো পথ বা মতাদর্শের সঙ্গে আত্মিক, ধর্মীয় বা বিশ্বাসগত আপসের কোনো সুযোগ নেই।
এ ছাড়া সুরা কাফিরুনকে নিয়ে নবীজি (সা.)-এর বিভিন্ন হাদিসে যে গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে, তা প্রমাণ করে এর আমলের ফজিলত ও আধ্যাত্মিক প্রভাব কতটা গভীর। প্রিয়নবী (সা.) নিজেও এ সুরাকে প্রতিদিনের আমলের অন্তর্ভুক্ত করতেন, যা আমাদের জন্যও অনুকরণীয়। সুরা কাফিরুন মুসলমানদের ইমানি শক্তি ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। এর পটভূমি, তাৎপর্য, আমল ও ফজিলত উল্লেখ করা হলো।
নাজিলের প্রেক্ষাপট : হজরত রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহান আল্লাহর একত্ববাদের বাণী প্রচার করেন। এই বাণী প্রচারে দাওয়াত দেওয়ার সময় মক্কার কুরাইশরা বিভিন্নভাবে তা প্রচারে বাধা সৃষ্টি করে। বিভিন্ন প্রচেষ্টা ও পরিকল্পনায় যখন তারা ব্যর্থ, তখন তারা হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একটি প্রস্তাব দেয়, যা ছিল ইসলাম ও মুসলমানের জন্য পুরোপুরি অনৈতিক। তারা হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একত্ববাদের দাওয়াত ও কুফরির মধ্যে একটি আপসের প্রস্তাব দেয়। অনৈতিক এ প্রস্তাবটি ছিল এমন, এক বছর তারা এবং সবাই তাদের মূর্তি পূজা করবে এবং আর এক বছর তারা এবং সবাই আল্লাহর ইবাদত করবে। (নাউজুবিল্লাহ)
এই অনৈতিক ও হাস্যকর প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে মহান আল্লাহ হজরত রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এই সুরাটি নাজিল করেন এবং নির্দেশ দেন তিনি যেন তাদের প্রস্তাব, আকিদা ও ধর্ম থেকে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করেন। আর এ সুরাটি অবতীর্ণ হওয়ার পরপরই মক্কার কিছু মুশরিক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং তারা আল্লাহর একত্ববাদকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন।
আমল : একদা এক সাহাবি হজরত রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আবেদন করে বলেন, আমাকে ঘুমের আগে পড়ার জন্য কোনো দোয়া বলে দিন। জবাবে রাসুল (সা.) সুরা কাফিরুন পড়তে আদেশ দেন এবং বলেন এটা শিরক থেকে মুক্তিপত্র। (সুনানে আবু দাউদ) হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, আমি হজরত রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি, তিনি ফজরের আগের দুই রাকাতে ‘কুল ইয়া আইয়্যুহাল কাফিরুন ও কুল হুয়াল্লাহু আহাদ’-এ দুই সুরা পড়তেন। (জামে তিরমিজি)
ফজিলত : সুরা কাফিরুন তেলাওয়াতের ফজিলত সম্পর্কে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কুল ইয়া আইয়্যুহাল কাফিরুন’ কোরআনের এক-চতুর্থাংশের সমান। (জামে তিরমিজি)
অর্থ : বলুন, হে অবিশ্বাসী সম্প্রদায়, আমি ইবাদত করি না, তোমরা যার ইবাদত করো। তোমরাও ইবাদতকারী নও, যার ইবাদত আমি করি। আমি ইবাদতকারী নই, যার ইবাদত তোমরা করো। তোমরা ইবাদতকারী নও, যার ইবাদত আমি করি। তোমাদের কর্ম ও কর্মফল তোমাদের জন্য এবং আমার কর্ম ও কর্মফল আমার জন্য।
