আন্তর্জাতিক এসএমই দিবস: ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ২৭ জুন ২০২৫, ০৮:৪০ পিএম

বিশ্বব্যাপী অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই গুরুত্বকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি দিয়ে জাতিসংঘ প্রতি বছর ২৭ জুন ‘আন্তর্জাতিক এসএমই দিবস’ হিসেবে পালন করে। এই দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বজুড়ে এসএমই খাতের গুরুত্ব তুলে ধরা, উদ্যোক্তাদের সম্মান জানানো এবং তাদের সহায়তায় নীতিনির্ধারকদের উদ্বুদ্ধ করা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এসএমই খাতের গুরুত্ব ও সম্ভাবনা অপরিসীম। তবে টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির জন্য এই খাতে চ্যালেঞ্জগুলোও কম নয়।

কারণ এসএমই বলতে এমন ধরনের শিল্প-প্রতিষ্ঠান বোঝানো হয় যেগুলোর কর্মসংস্থান সীমিত, মূলধন সীমিত পরিসরে থাকে, কিন্তু উৎপাদন ও সেবায় যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের সংজ্ঞা অনুসারে, কর্মসংস্থানের সংখ্যা এবং বিনিয়োগের পরিমাণের ভিত্তিতে একটি প্রতিষ্ঠানকে মাইক্রো, ক্ষুদ্র বা মাঝারি উদ্যোগ হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। এই খাতের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নমনীয়তা, স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য প্রবেশের সুযোগ।

বাংলাদেশে এসএমই খাতের বর্তমান অবস্থা

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এসএমই খাত একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য মতে, দেশের প্রায় ৮৭% শিল্প প্রতিষ্ঠান এসএমই খাতভুক্ত, যেখানে মোট শ্রমশক্তির প্রায় ২৫% নিয়োজিত। কৃষি বহির্ভূত খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এসএমই খাতের অবদান প্রায় ৪০%। বিশেষ করে নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশে এসএমই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গার্মেন্টস, ফার্নিচার, হস্তশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, ই-কমার্সসহ নানা খাতে এসএমই উদ্যোক্তারা সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।

আন্তর্জাতিক এসএমই দিবসের তাৎপর্য

২০১৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২৭ জুনকে ‘মাইক্রো, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম সাইজড এন্টারপ্রাইজ ডে’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই উদ্যোগটি এসএমই খাতকে বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব ও মর্যাদা দেওয়ার উদ্দেশ্যে গৃহীত হয়। দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য হয়ে থাকে—এসএমই খাতের টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা, উদ্যোক্তাদের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং নীতিনির্ধারকদের এই খাতে বিনিয়োগ ও প্রণোদনা দিতে উৎসাহিত করা। এ বছরের এসএমই দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে– ‘টেকসই ভবিষ্যতের জন্য এমএসএমইকে ক্ষমতায়ন’। বিশ্বব্যাংক, আইএলও, ইউএনডিপি এবং অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থাও এই দিবসকে কেন্দ্র করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করে।

এসএমই খাতের সম্ভাবনা

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এসএমই খাতের সম্ভাবনা অপরিসীম। প্রথমত, তরুণ জনগোষ্ঠী এবং প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যবহার উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। ই-কমার্স, এগ্রিটেক, ফিনটেক এবং গ্রিন বিজনেসে অনেক নতুন এসএমই উদ্যোক্তার আগমন ঘটছে। দ্বিতীয়ত, কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে মানুষ নিজের কাজ শুরু করার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

তৃতীয়ত, সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর নানা উদ্যোগ—যেমন প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, এক্সপোর্ট হাউস গঠন—এসএমই খাতকে শক্তিশালী করে তুলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিম, এসএমই ফাউন্ডেশন ও বিডার সহায়তা, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পৃথক তহবিল, এসব উদ্যোগ উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করছে।

নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ

এসএমই খাত নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে সবচেয়ে কার্যকর প্ল্যাটফর্ম। ঘরোয়া শিল্প, হস্তশিল্প, ফ্যাশন ডিজাইনিং, কসমেটিকস ও অনলাইন ব্যবসায় নারীরা এখন দৃশ্যমানভাবে অংশ নিচ্ছেন। বিশেষত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে ‘উই’ (উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম) বা ‘শেকড়’-এর মতো প্ল্যাটফর্ম নারীদের আত্মনির্ভরশীল হতে সাহায্য করছে।

অন্যদিকে, তরুণ উদ্যোক্তারা প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপ তৈরি করে অর্থনীতির গতি বাড়াচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও এখন ব্যবসায়িক ধারণা নিয়ে এসএমই খাতে প্রবেশ করছেন। তবে তাদের জন্য পুঁজি, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শক সহায়তা একান্ত প্রয়োজন।

এসএমই খাতের চ্যালেঞ্জ

তবে এসএমই খাতের সামনে রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ যেগুলো বিভিন্ন কারণে মোকাবেলা করতে হিমশিম খেতে হয়- 

প্রথমত, সহজ শর্তে অর্থায়নের অভাব এখনো অনেক উদ্যোক্তার জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা । ব্যাংকিং প্রক্রিয়ার জটিলতা, জামানতের অনুপস্থিতি এবং কখনও বা উচ্চ সুদের হার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করে।

দ্বিতীয়ত, বাজারজাতকরণ ও ব্র্যান্ডিংয়ে সীমাবদ্ধতা থাকায় অনেক ভালো পণ্যেরও বাণিজ্যিক সাফল্য হয় না।

তৃতীয়ত, ডিজিটাল জ্ঞানের অভাব এবং দক্ষ জনশক্তির সংকট অনেক প্রতিষ্ঠানকে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে রাখে।

চতুর্থত, নীতিনির্ধারণে এসএমই খাতের আওয়াজ অনেক সময় উপেক্ষিত থেকে যায়। উদ্যোক্তা বান্ধব ট্যাক্স নীতি, অনলাইন লাইসেন্সিং, সাপ্লাই চেইনে অন্তর্ভুক্তি—এইসব বিষয়ে আরো অগ্রগতি প্রয়োজন।

ভবিষ্যৎ করণীয়

বাংলাদেশের এসএমই খাতকে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক করতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি:

১. সহজ অর্থায়ন: জামানতবিহীন মাইক্রো-ক্রেডিটের আওতা বৃদ্ধি এবং ফিনটেক প্ল্যাটফর্মে ঋণপ্রদানের ব্যবস্থা চালু করা।

২. প্রশিক্ষণ ও ইনকিউবেশন: সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা এবং স্টার্টআপ ইনকিউবেশন হাবে সুযোগ বাড়ানো।

৩. ডিজিটাল সক্ষমতা: ই-কমার্স, ডিজিটাল মার্কেটিং, কাস্টমার রিলেশন ব্যবস্থাপনা বিষয়ে উদ্যোক্তাদের আরো বেশি প্রশিক্ষণ দেওয়া।

৪. নারী ও তরুণদের জন্য বিশেষ প্যাকেজ: প্রণোদনা, ট্যাক্স ছাড় এবং ‘মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম’ চালু করা। যেন নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় । 

৫. নীতি সংস্কার ও তথ্যভিত্তিক সমর্থন: নীতিনির্ধারণে এসএমই খাতের তথ্য-উপাত্তের ব্যবহার ও অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা।

পরিশেষে, আন্তর্জাতিক এসএমই দিবস শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি উদ্যোক্তা সংস্কৃতি গড়ে তোলার এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। বাংলাদেশ যদি  নির্ধারিত সময়ের মধ্যে একটি উন্নত দেশ হতে চায়, তাহলে এসএমই খাতকে আরও শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা ছাড়া বিকল্প নেই। সঠিক দিকনির্দেশনা, নীতিগত সহায়তা ও সমাজের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে এসএমই উদ্যোক্তারাই হতে পারেন বাংলাদেশের উন্নয়নের নতুন চালিকা শক্তি। এই এসএমই দিবসে - উদ্যোক্তাদের পাশে থাকার ও তাদের স্বপ্নকে বাস্তবায়নের সহযাত্রী হবার প্রতিজ্ঞাই দিনটিকে আরো অর্থবহ করে তুলতে পারে। 

লেখক: ব‍্যাংকার ও উন্নয়ন গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত