সকালে বই-খাতা বুকে জড়িয়ে খালের পাড়ে এসে দাঁড়ায় ছোট্ট শিশুরা। স্কুলের ঘণ্টা বেজে ওঠার আগেই তাদের প্রথম পরীক্ষা—একটি ড্রামের ভেলায় চড়ে খাল পার হওয়া। ভেলাটি দুলতে থাকে, শিশুরা শক্ত করে ধরে রাখে পাশের রশি। কারও চোখে ভয়, কারও চোখে অভ্যাস। এভাবেই খুলনার সুন্দরবন-সংলগ্ন কয়রা উপজেলার মঠবাড়ী গ্রামের শত শত শিক্ষার্থীর দিন শুরু হয়।
২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলার ভয়াল জলোচ্ছ্বাস শাকবাড়িয়া নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে দিয়েছিল। সেই ভয়ংকর স্রোতে গ্রামের মাঝখান দিয়ে সৃষ্টি হয় একটি বিশাল খাল, যা মঠবাড়ী গ্রামকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দেয়। সময়ের সঙ্গে অনেক ক্ষত মুছে গেলেও এই খাল আজও রয়ে গেছে আইলার জীবন্ত স্মৃতি। ২০২৬ সালেও সেখানে নির্মিত হয়নি একটি স্থায়ী সেতু।
খালের এক পাশে প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মঠবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক ও সুপেয় পানির উৎস। অন্য পাশে কয়েক হাজার মানুষের বসতি। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া, চিকিৎসা নেওয়া কিংবা বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ—সবকিছুর জন্যই ভরসা সেই ড্রামের ভেলা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রথমে ছোট নৌকায় পারাপার করা হলেও তা নিয়মিত পাওয়া যেত না। পরে গ্রামবাসী নিজেরাই প্লাস্টিকের ড্রাম ও কাঠ দিয়ে একটি ভেলা তৈরি করেন। সেটিই এখন পুরো গ্রামের জীবনরেখা।
বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। স্রোত বেড়ে গেলে ভেলা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা বই-খাতা ভিজিয়ে খালে পড়ে যায়। অভিভাবকেরা সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়েও সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় থাকেন।
প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, শুধু একটি সেতুর অভাবে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসতে পারে না। দেরি, ঝুঁকি ও আতঙ্ক তাদের শিক্ষাজীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত ১৭ বছরে জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা বহুবার এলাকা পরিদর্শন করেছেন। সেতুর প্রতিশ্রুতিও মিলেছে বারবার। কিন্তু বাস্তবে কোনো স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ হয়নি। ফলে আইলার পর জন্ম নেওয়া অনেক শিশুও আজ স্কুলে যাচ্ছে সেই একই ভেলায়, যেটি তাদের আগের প্রজন্ম ব্যবহার করত।
কয়রা উপজেলার বিভিন্ন জনসমস্যা সমাধানে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসা সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান এইচ এম শাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলে একটি নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা শুধু শিক্ষার জন্য নয়, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, ঘূর্ণিঝড় আইলার ১৭ বছর পরও মঠবাড়ীর মানুষ একটি স্থায়ী সেতুর অপেক্ষায় দিন গুনছেন। একটি সেতুর অভাবে প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থীসহ হাজারো মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খাল পারাপার করতে বাধ্য হচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য আবু সাইদ বলেন, ‘এই খালের দুই পাশে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি ক্লিনিক ও বাজার রয়েছে। প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থীসহ কয়েক হাজার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করেন। একটি সেতু নির্মাণ হলে পুরো এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে।’
কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদের সীমিত বাজেটে এত বড় খালের ওপর সেতু নির্মাণ সম্ভব নয়। তবে মানুষের দুর্ভোগ কমাতে ড্রামের ভেলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিষয়টি একাধিকবার উপজেলা সমন্বয় সভায় উত্থাপন করেছি। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর দ্রুত একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করবে বলে আশা করছি।’
কয়রা উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।’