রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ট্যাগিং প্রবণতা

আপডেট : ৩০ জুন ২০২৫, ১২:২৯ এএম

রাজনীতিতে ‘ট্যাগিং’ একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা সৃষ্টি করেছে। এটি শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক গোষ্ঠী, এমনকি ব্যক্তিরাও একে অপরকে ভুল তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে বদনাম করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। মূলত ২০১৩ সালের ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ থেকে ট্যাগিং রাজনীতি শুরু হয়। তখন রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিভাজনকে কিছু সহজ পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা হয়। যেমন- শাহবাগি বনাম ইসলামপন্থি, ভারতপন্থি বনাম পাকিস্তানপন্থি, রাজাকার বনাম ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। এই বিভাজন শুধু রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা সামাজিক সম্পর্কেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল, যা এখনো রয়ে গেছে।

বাংলাদেশে গত কয়েক দশক ধরে ট্যাগ সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর আমাদের সবার প্রত্যাশা ছিল, জাতি এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে সব শ্রেণি-পেশা ও মতাদর্শের মানুষের জন্য নিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলবে। সেই লক্ষ্যে কর্মসূচি ঘোষণা এবং তা বাস্তবায়নে সরকারসহ সব পক্ষই নিজ নিজ কাজে মনোনিবেশ করবে। দুঃখজনক হচ্ছে, সেই পথে না এগিয়ে বরং আমরা পূর্বের ধারাবাহিকতা বহন করছি। সরকার বদলালেও ঘৃণাত্মক, তুচ্ছার্থক ট্যাগ দিয়ে ভিন্নমতকে দমানোর রাজনৈতিক ধারায় গুণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। যে যা নয়, তাকে সেই পরিচয়ে পরিচিত করার চেষ্টা সন্দেহাতীতভাবে অপরাজনীতি বলে গণ্য হবে। ট্যাগের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে সমাজের সচেতন মানুষ মাত্রই উদ্বিগ্ন। আশাজাগানিয়া এই প্রজন্ম আমাদের নতুন বাংলাদেশের যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তাতে আমরা আশান্বিত হয়েছিলাম। আমরা তরুণদের ওপর আস্থা রেখে বলতে চাই এখনো সব শেষ হয়নি, নতুন করে দেশকে সাজানোর সুযোগ আমাদের রয়েছে। রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করে আমরা সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণে উদ্যোগী হতে পারি। এই উদ্যোগের প্রথম কাজটাই হতে পারে রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংস্কার।

ট্যাগের রাজনৈতিক সংস্কৃতির চূড়ান্ত পরিণতি দেখছে বাংলাদেশ। প্রতিহিংসার রাজনীতির শিকার অনেকে। যারা খানিকটা প্রতিবাদী ছিলেন, তারাও ট্যাগের হাত থেকে বাঁচতে চুপ থাকছেন। এটাই ট্যাগ দেওয়ার সংস্কৃতির ভয়ংকর রূপ। এটি আমাদের জাতিগত বিভাজনকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে বৃদ্ধি পাচ্ছে পারস্পরিক অবিশ্বাস, বিভেদ ও সংঘাত। এই ট্যাগের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি। এর উপায় হতে পারে, জাতীয় ঐক্যের কমন গ্রাউন্ড তৈরি করা। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এই অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু দেশে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও ট্যাগ রাজনীতির আক্রমণ দেখা গিয়েছে। যে জন্য ভীত সন্ত্রস্ত সাংস্কৃতিক কর্মীরাও নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

ভিন্নমত সহ্য না করা শাসক, শোষক এবং আধিপত্যবাদী সমাজ ব্যবস্থার এক স্বাভাবিক প্রবণতা। ধর্ম, বর্ণ কিংবা রাষ্ট্র যে কোনো মোড়কেই শাসন এবং শোষণের প্রক্রিয়া যখন সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে, তখনই প্রকাশ ঘটে চূড়ান্ত অসহনশীলতার।  সহনশীলতার অভাবে কথার প্রতিবাদ কথায় না হয়ে, পৌঁছে যায় সহিংসতায়। ট্যাগের চাবুক তখন হাতিয়ার, বৈধতা এনে দেয় সংঘাতের। মত চেপে ধরার জন্য হত্যাকাণ্ড ঘটে। জ্ঞান, বিজ্ঞান, ইতিহাস ও সমাজ-সংস্কৃতির মানবিক পাঠ থেকে দূরে থাকা প্রজন্ম, ট্যাগ সংস্কৃতিকে নানা উপায়ে উপভোগ্য করে তোলে। যে কারণে আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলে, সেই চিত্র দেখতে পাই। এই প্রজন্মের দিকভ্রষ্ট একটা অংশের ট্রল, ব্যঙ্গ-বিদ্রু প, মিম সূক্ষ্মভাবে ট্যাগের প্রক্রিয়াকে সমন্বিত করে। ট্যাগের এই প্রক্রিয়া ও ধরন নিয়েও গবেষণা প্রয়োজন। নতুনদের ভাষাভঙ্গি ও ট্যাগ সংস্কৃতিকে ভালোভাবে বুঝে উঠতে না পারলে, এই রোগ থেকে মুক্তি সম্ভব নয়। ট্যাগের রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেভাবে অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে, তাতে সমাজে ভয়ংকর বিপর্যয় আসন্ন। কালক্ষেপণ না করে এর বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা দরকার।

আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে সহনশীলতা এবং ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে পরিবার, সব জায়গায় মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে উৎসাহিত করতে হবে, নিজেদের কর্মীদের মধ্যে এই মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতে। গণমাধ্যম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি বড় দায়িত্ব রয়েছে। তাদের মিথ্যা তথ্য এবং বিদ্বেষমূলক প্রচার রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সংবাদ পরিবেশনে বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখা এবং ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনাকে উৎসাহিত করা অপরিহার্য। শুধু ক্লিক বা ভিউ বাড়ানোর জন্য বিতর্কিত ট্যাগিংকে প্রচার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। মিথ্যা তথ্য ছড়ানো, চরিত্র হনন বা বিদ্বেষ ছড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন এবং তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে না পারলে এই প্রবণতা বন্ধ করা যাবে না। যারা অনলাইন বা অফলাইনে ট্যাগিং রাজনীতির মাধ্যমে সমাজের ক্ষতি করছে, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে এই আইনগুলো যেন ভিন্ন মত দমনের হাতিয়ারে পরিণত না হয়, সেদিকেও লক্ষ্য রাখা দরকার।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ট্যাগিং রাজনীতি পরিহার করে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের বক্তৃতা, প্রচার এবং অনলাইন কার্যক্রমে প্রতিপক্ষকে ট্যাগ না করে গঠনমূলক সমালোচনা এবং নিজেদের নীতি ও কর্মসূচির ওপর জোর দিলে আস্তে আস্তে তা কমে আসবে। বাংলাদেশের রাজনীতি এখন সংকটময় মোড়ে। যে কারণে ট্যাগিং প্রবণতা সাময়িকভাবে কাউকে সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি বিপজ্জনক। জনগণ চায় এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ, যেখানে জনমতকে ভুল তথ্য দিয়ে নিয়ন্ত্রণ না করে, ভালো কাজের ভিত্তিতে নির্বাচন করা। যদি এই বিভ্রান্তির রাজনীতি চলতে থাকে, তাহলে একসময় এটি শুধু কোনো নির্দিষ্ট দল নয়, বরং পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেই চ্যালেঞ্জ করতে পারে।

লেখক : শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত