‘ভুয়া মামলা’ ও ‘গ্রেপ্তার-বাণিজ্য’ বন্ধে ফৌজদারি কার্যবিধিতে সংশোধন এনেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ফলে প্রাথমিক তদন্তে যদি কোনো আসামির সম্পৃক্ততা না পাওয়া যায়, তাহলে প্রাথমিক পর্যায়েই তার নাম বাদ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। গতকাল রবিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই সংশোধনীতে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। আজ সোমবার এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ হতে পারে।
এ ছাড়া বাংলাদেশে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের মিশন (ওএইচসিএইচআর) স্থাপনের বিষয়েও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে ওই বৈঠকে।
বৈঠক শেষে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘কিছু জিনিস নিয়ে আমরা নিজেরাই বিব্রত। একটা হচ্ছে ভুয়া বা মিথ্যা মামলা করা; আরেকটা হচ্ছে মামলার ঘটনা সত্যি, কিন্তু সেখানে অনেক লোককে আসামি করে মামলা-বাণিজ্য করা। সেজন্য আমরা সবার সঙ্গে আলোচনা করে সিআরপিসিতে একটা গুরুত্বপূর্ণ চেইঞ্জ এনেছি।’ সংশোধনী ব্যাখ্যা করতে গিয়ে
আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘পুলিশ কমিশনার, এসপি বা এসপি পদমর্যাদার কোনো কর্মকর্তা যদি মনে করেন, ওনার এলাকায় কোনো মামলার প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন নিতে পারেন। পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে তদন্ত কর্মকর্তা প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দেবেন। বিচারক যদি মনে করেন, কোনো কোনো আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ নেই, সাক্ষ্য নেই, তাহলে “ফ্রি ট্রায়াল স্টেজে” তাদের নাম বাদ দিতে পারবেন। আবার যাদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, অপরাধের প্রমাণ মিললে আসামির তালিকায় তাদের নাম যুক্ত করতে পারবেন।’
এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অনেক নিরপরাধ মানুষ হয়রানি থেকে বেঁচে যাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন আইন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, তখন মামলা-বাণিজ্য থেকে অনেকে রেহাই পাবেন। কিন্তু এর মানে এই নয় যে মামলার তদন্ত থেমে থাকবে। তদন্ত চলতে থাকবে। আবার পুলিশ যদি পরবর্তী সময়ে দেখে, আগে যাদের মামলা থেকে রেহাই দেওয়া হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে পরে প্রকৃত প্রমাণ পাওয়া গেছে, তখন তাদের নাম আবার মামলায় যুক্ত করতে পারবে।
‘এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে কেউ যদি ভুয়া মামলা বা হয়রানিমূলক মামলার শিকার হন, তাদের বিচার শুরুর আগেই রেহাই দেওয়া,’ যোগ করেন আসিফ নজরুল।
ফৌজদারি কার্যবিধিতে সংশোধন প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘খুনের মতো মামলায় তদন্ত দুই থেকে চার বছর পর্যন্ত চলে। এ সময় শত শত মানুষ আসামি হিসেবে তালিকাভুক্ত থাকেন। তাদের মধ্যে অনেকেই বছর বছর গ্রেপ্তারের আতঙ্কে থাকেন। সংশোধনের ফলে নির্দোষ ব্যক্তিরা সেই অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পাবেন।’
এ সময় বাংলাদেশে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের মিশন (ওএইচসিএইচআর) স্থাপন করা হচ্ছে বলেও জানান অধ্যাপক আসিফ নজরুল।
আইন উপদেষ্টা বলেন, অফিস স্থাপন নিয়ে এমওইউ (সমঝোতা স্মারক) স্বাক্ষরের বিষয় উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে সবাই একমত পোষণ করেছেন। আরও কিছু আলোচনার পর চূড়ান্ত খসড়াটি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থার প্রধান ফলকার তুর্ককে পাঠানো হবে, তিনি তার মতামত দিলে দ্রুততম সময়ে এটি স্বাক্ষরিত হবে। প্রাথমিকভাবে তিন বছরের জন্য ওএইচসিএইচআরের অফিস হবে, পরে এটি রিনিউ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন হলে এই সংস্থা শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
এ ছাড়া দেশে সৌরবিদ্যুতের প্রসারে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয় উপদেষ্টা পরিষদের ওই বৈঠকে।
কুমিল্লার মুরাদনগরে সংঘটিত ধর্ষণের বিষয়ে ব্রিফিংয়ে আসিফ নজরুল বলেন, ‘এ ঘটনায় বাংলাদেশের যেকোনো সাধারণ নাগরিকের মতো আমরা মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ। আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নিয়েছে। প্রধান আসামি এবং যারা ওই ছবি বা ভিডিওগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো অপরাধ করেছে, তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা ধর্ষণবিষয়ক আইনে সময়োপযোগী সংশোধন এনেছি, এর প্রমাণ আপনারা মাগুরার ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে দেখেছেন। এ ঘটনাটির ক্ষেত্রেও আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচার করব, সে বিষয়ে আমরা বদ্ধপরিকর।’
