পটুয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই বেড়িবাঁধের অভাব, অপ্রতুল সাইক্লোন শেল্টার, দুর্বল জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সচেতনতার ঘাটতির কারণে প্রায় এক লাখ মানুষ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও উপকূলবাসীর জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা এখনো অরক্ষিত রয়ে গেছে।
বঙ্গোপসাগরে এপ্রিল-মে এবং অক্টোবর-নভেম্বর মাসে সমুদ্রের উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার কারণে ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা বাড়ে। এসব ঝড় উপকূলে আঘাত হানলে জলোচ্ছ্বাসের মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষতি হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬০ সাল থেকে দেশের উপকূলে ৩৭টি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে। উল্লেখযোগ্য ঝড়গুলোর মধ্যে রয়েছে ১৯৭০ সালের ভোলার ঘূর্ণিঝড় (৫ লাখ প্রাণহানি), ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঝড় (১.৩৮ লাখ প্রাণহানি, ১০ লাখ বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত), এবং ২০০৭ সালের সিডর (বেসরকারি হিসেবে প্রায় ১০ হাজার প্রাণহানি, ৬ লাখ বসতবাড়ি ধ্বংস)। এ ছাড়া ‘আইলা’ (২০০৯), ‘আম্ফান’, ‘ফণি’, ‘রিমাল’ ইত্যাদি ঝড়ও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করেছে।
পটুয়াখালীতে ৭০৩টি সাইক্লোন শেল্টার এবং ৩৫টি মুজিব কিল্লা থাকলেও এগুলো ঝুঁকিপ্রবণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় অপ্রতুল। বিশেষ করে দূরবর্তী চরাঞ্চলে শেল্টার নির্মাণের ঘাটতি রয়েছে। বিদ্যমান শেল্টারগুলোর অধিকাংশের যাতায়াত পথ কাঁচা, যা বর্ষাকালে কর্দমাক্ত হয়ে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের চলাচলের জন্য অযোগ্য হয়ে পড়ে। অনেক শেল্টারে পানি, বিদ্যুৎ, স্যানিটেশন এবং গবাদি পশু ও গৃহপালিত প্রাণির আশ্রয় ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। ফলে দুর্যোগের সময় মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে নিরুৎসাহিত হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৫ হাজার ১০৭ কিলোমিটার বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের মধ্যে ৯৫৭ কিলোমিটার সমুদ্রতীরবর্তী। পটুয়াখালীতে ৩৬টি পোল্ডারের অধীনে ১ হাজার ৮১৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে, যার মধ্যে কলাপাড়া ও রাঙ্গাবালী উপজেলায় রয়েছে ৫১৮ কিলোমিটার। এর মধ্যে ১৮ কিলোমিটার অতি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৩৪ কিলোমিটার আংশিক ঝুঁকিপূর্ণ। ১৯৬০-এর দশকে নির্মিত এসব বাঁধ দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ২০০৭ সালের সিডরে ২ হাজার ৩৪১ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার মধ্যে পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, ঝালকাঠি, বরিশাল ও পিরোজপুরে ১৮০ কিলোমিটার সম্পূর্ণ এবং ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব বাঁধের টেকসই মেরামত না হওয়ায় বর্ষাকালে উচ্চ জোয়ারের পানি বাঁধ টপকে লোকালয়ে প্রবেশ করে, যা বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) আওতায় ৮ হাজার ৭৬০ জন স্বেচ্ছাসেবী সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছেন। তবে, দুর্যোগের পূর্বে বা চলাকালীন মানুষকে শেল্টারে নেওয়া এবং উদ্ধারের জন্য আধুনিক সরঞ্জাম বা পরিবহন ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ ও পুনর্বাসনেও ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা প্রশান্তমন ভৌমিক বলেন, ‘কাঁচা রাস্তা বর্ষায় কাদাময় হয়ে যায়, যা বৃদ্ধ, শিশু ও নারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। শেল্টারে পানি-বিদ্যুৎ নেই। পরিবহন ব্যবস্থা থাকলে সুবিধা হতো।’
মহিপুর ইউনিটের সিপিপি টিম লিডার মিজানুর রহমান বলেন, ‘সম্পদ চুরির ভয়ে অনেকে শেল্টারে যেতে চান না। উদ্ধারের জন্য আধুনিক ব্যবস্থা প্রয়োজন।’
কলাপাড়া উপজেলা সিপিপি সহকারী পরিচালক আসাদ-উজ্জামান খান জানান, শেল্টারের যাতায়াত পথ পাকা করতে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। অধিকাংশ শেল্টারে সোলার সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে, তবে কিছু সিস্টেম দীর্ঘ ব্যবহারে নষ্ট হয়ে গেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এগুলো মেরামত বা নতুন বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
