শিশুপার্কে যায় না শিশুরা

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২৫, ০৭:৫৯ এএম

খুলনা মহানগরীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত গোলকমনি শিশুপার্ক। নামে শিশুপার্ক হলেও সেখানে শিশুদের খেলাধুলার জন্য কোনো রাইড নেই। নেই শিশুবান্ধব ন্যূনতম পরিবেশও। শুধু গোলকমনি শিশুপার্কই নয়, খুলনা সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন সাতটি পার্কের অবস্থাই প্রায় একরকম। কোনো পার্ক ব্যবহৃত হয় সামাজিক অনুষ্ঠানের ভেন্যু হিসেবে। কোনোটিতে আবার চলে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি। কোনো কোনো পার্কে চলে মাদকসেবীদের আড্ডা। নগরীর কোনো শিশুপার্কই শিশুদের খেলাধুলা ও বিনোদনের জন্য উপযুক্ত নয়। ফলে নগরে বসবাসকারী লাখ লাখ শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ নিয়ে শিশুদের অভিভাবকরা ক্ষুব্ধ ও হতাশ।

করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির অধীনে নগরে সাতটি পার্ক রয়েছে। এগুলো হলো : নিরালা পার্ক, সোনাডাঙ্গা সোলার পার্ক, গল্লামারী লিনিয়ার পার্ক, শহীদ হাদিস পার্ক, খালিশপুর শিশুপার্ক, জাতিসংঘ শিশুপার্ক এবং গোলকমনি শিশুপার্ক। পার্কগুলো পরিদর্শন ও খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, এই সাতটি পার্কের মধ্যে গোলকমনি শিশুপার্ক কেবল নামেই শিশুপার্ক। এখানে রাইড বা শিশুবান্ধব বিনোদনের কোনো পরিবেশ নেই। পার্কটি মাঝেমধ্যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ভেন্যু হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত সোলার পার্কেও উপযুক্ত পরিবেশের অভাব রয়েছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে মানুষ এখানে ভিড় করতে চান না। সন্ধ্যা নামলেই পার্কটি মাদকসেবীদের আড্ডায় পরিণত হয়, এমনকি প্রকাশ্যে মাদক সেবনও চলে।

নগর ভবনের সামনে অবস্থিত শহীদ হাদিস পার্কে বেশিরভাগ সময় রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়, যার ফলে সেখানেও শিশুদের খেলাধুলার সুযোগ বা পরিবেশ নেই। নিরালা পার্কে চারটি দোলনা থাকলেও তা ভাঙাচোরা।

পার্কের বেশিরভাগ অংশে সীমানাপ্রাচীর নেই, এবং প্রধান ফটক বন্ধ করে নির্মাণসামগ্রী রাখা হয়েছে। গল্লামারী লিনিয়ার পার্ক ও খালিশপুর শিশুপার্ক ইজারা দেওয়া হয়েছে, যেখানে প্রবেশমূল্য থেকে রাইড ফি সবই নি¤œবিত্তের সাধ্যের বাইরে। ফলে জনসাধারণের কাছে জাতিসংঘ শিশুপার্কের নামমাত্র রাইডই একমাত্র ভরসা। তবে সেখানেও এখন মাঝেমধ্যে মেলা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ ছাড়া কিছু পার্কে চা ও খাবারের দোকান বসানো হয়েছে। নিরালা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা আবু সাঈদ ও তারেকুজ্জামান জানান, নিরালা পার্কের প্রধান ফটকে নির্মাণসামগ্রী রাখা আছে। ছয়টি রাইড রয়েছে, তবে তা ভাঙাচোরা। সীমানাপ্রাচীর ও বাথরুমও নেই বা পরিত্যক্ত। ফলে পার্কে শিশুদের খেলার উপযুক্ত পরিবেশ নেই। গত পাঁচ মাস ধরে এই পার্কে কোনো শিশু আসেনি, যা আবাসিক এলাকার অভিভাবকদের জন্য হতাশাজনক। খুলনা সরকারি সুন্দরবন কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও মনোবিজ্ঞানী প্রকাশ চন্দ্র অধিকারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, শহরের শিশুদের জীবনযাত্রা বাসা-বাড়িকেন্দ্রিক। তাই শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলা ও বিনোদনের গুরুত্ব অপরিসীম। খেলাধুলা ও বিনোদন শিশুদের চিন্তাভাবনা, নেতৃত্ব, ভাবের আদান-প্রদান ও মেলামেশার গুণাবলি গড়ে তোলে, যা তাদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে সহায়তা করে। এ ছাড়া খেলাধুলায় মনোযোগী শিশুরা মোবাইল আসক্তি ও সামাজিক অসৎ কাজ থেকে দূরে থাকে। কিন্তু নগরের পার্কগুলোর দৈন্যদশার কারণে শিশুদের এই বিকাশের সুযোগ সীমিত, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উদ্বেগজনক। খুলনা শিশু হাসপাতালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশের বিকল্প নেই। পার্কগুলোতে দোলনা, রাইড স্থাপন ও নিরাপত্তা বৃদ্ধির মাধ্যমে শিশুদের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবির-উল-জব্বার বলেন, পার্কগুলোকে শিশুবান্ধব ও উন্নত করতে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে রাইডসহ সব চাহিদা পূরণ হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত