নতুন বাংলাদেশের টার্নিং পয়েন্ট শহীদ আবু সাঈদ

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৫, ০৭:২৩ এএম

জুলাই ফুঁসে উঠছিল তখন। একদিকে ক্ষোভ-বিক্ষোভে জনতা, অন্যদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনে ছাত্ররা। একটু একটু করে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। কিন্তু রংপুর ছিল একটু আলাদা। সেদিন ছিল ১৬ জুলাই। গুলি এসে লাগে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র আবু সাঈদের বুকে। শহীদ হন তিনি। ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারকে সরাতে আবু সাঈদের আত্মত্যাগই ছিল টার্নিং পয়েন্ট। তিনি ছিলেন আন্দোলনের প্রথম শহীদ।

আজ ১৬ জুলাই আবু সাঈদের শহীদ হওয়ার এক বছর। অন্তর্বর্তী সরকার ১৬ জুলাইকে ‘জুলাই শহীদ দিবস’ হিসেবে নামকরণ করেছে। এর আগে ‘শহীদ আবু সাঈদ দিবস’ ঘোষণা করা হয়েছিল। পরে তা পরিবর্তন করা হয়। ‘জুলাই শহীদ দিবস’ উপলক্ষে আজ বুধবার রাষ্ট্রীয় শোক পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গতকাল মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

আজ বাংলাদেশের সব সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব সরকারি এবং বেসরকারি ভবন ও বিদেশে বাংলাদেশ মিশনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। শহীদদের মাগফিরাতের জন্য আজ বাংলাদেশের সব মসজিদে বিশেষ দোয়া হবে। অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে তাদের আত্মার শান্তির জন্য বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হবে।

দিনটি উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান। আজ আবু সাঈদসহ শহীদদের স্মরণ করবেন তাদের পরিবার, আত্মীয়স্বজন, সহপাঠী, সহযোদ্ধাসহ পুরো জাতি। শহীদ পরিবার ও সহযোদ্ধাদের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদকালেই আবু সাঈদসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সব হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত শেষ করতে হবে।

আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন বলেন, ‘আবু সাঈদ পুরো পরিবারের আশার আলো ছিল। সে শহীদ হওয়ার এক বছর হয়ে গেল। মনে হচ্ছে গতকালের ঘটনা। তার মৃত্যু আমাদের স্বপ্নগুলো ভেঙে দিয়েছে। আশা করি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শিগগিরই আবু সাঈদসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত সব হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে।’

আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘ছেলে হারানোর বেদনা কোনোভাবেই সহ্য করা যাচ্ছে না। হত্যাকাণ্ডের বিচার হলে হয়তো কিছুটা স্বস্তি পাব।’

গত বছর ১৬ জুলাই আন্দোলনের সময় পুলিশের ধাওয়ায় শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লে আবু সাঈদ বেরোবির ১ নম্বর গেটসংলগ্ন রাস্তায় পুলিশের সামনে দুহাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকেন। ঠিক সেই মুহূর্তে রাস্তার বিপরীত পাশ থেকে সরাসরি তার ওপর গুলি চালানো হয়। আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা দেশ জুড়ে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটায়। এ ঘটনায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। কোটা সংস্কার আন্দোলন রূপ নেয় সরকার পতনের অভ্যুত্থানে।

আবু সাঈদের নিহত হওয়ার ঘটনায় পুরো রংপুর নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক দখলে নেন শিক্ষার্থীরা। সেদিন আবু সাঈদের মরদেহ পুলিশ আড়াই ঘণ্টা গুম করে রেখেছিল। সেই সঙ্গে রাতেই লাশ দাফনের জন্য প্রবল চাপ তৈরি করেছিল পরিবারের ওপর। আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। একটি মামলা করা হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে, অন্যটি তার পরিবারের পক্ষ থেকে।

কর্মসূচি : কোটা সংস্কার আন্দোলনে প্রথম শহীদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রশাসন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন দিনব্যাপী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনে প্রথম শহীদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে দিনব্যাপী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বেরোবি প্রশাসন। দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন অন্তর্বর্তী সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা প্রফেসর ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম, বীরপ্রতীক। অনুষ্ঠানে আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন থাকবেন প্রধান অতিথি।

এ ছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এস এম এ ফায়েজ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব সিদ্দিক জোবায়ের এবং বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দীন খান।

এদিকে কর্মসূচির অংশ হিসেবে রংপুরে আসবেন এবি পার্টির কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারা।

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া আবু সাঈদ ছয় ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট। তার তিনজন বোন রয়েছে। পরিবারের সদস্যরা জানান, আবু সাঈদের মৃত্যুতে পুরো পরিবার যেন নিঃসঙ্গ হয়ে গেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত