জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘আপনারা জানেন গোপালগঞ্জে হামলা চালানো হয়েছে। বাংলাদেশে আরও ১০টা জায়গায় হামলা হতে পারে। এতেও আমাদের দমন করা যাবে না। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে মুজিববাদের বিরুদ্ধে যে লড়াই আমরা ঘোষণা করেছি, সেই লড়াই শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমরা থামব না।’
গতকাল শুক্রবার দুপুরে মুন্সীগঞ্জ শহরের কৃষি ব্যাংক মোড়ে এনসিপির দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রার পথসভায় বক্তৃতাকালে তিনি এসব কথা বলেন। নাহিদ বলেন, ‘আমরা জানি সামনে আমাদের আরও একটি লড়াই আসতেছে। আমরা সেই লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমরা জানি আমাদের লড়াই অনেকের সঙ্গে করতে হবে।’
মুন্সীগঞ্জ জেলা সমন্বয়ক কমিটির আহ্বায়ক মাজেদুর ইসলামের সভাপতিত্বে এতে বক্তৃতা করেন এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ ও উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জাতীয় যুবশক্তির কেন্দ্রীয় সংগঠক মো. মেহেদী হাসান, মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা এনসিপির প্রধান সমন্বয়কারী গাজী আব্দুল আলিম, যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ সেলিম, মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান প্রমুখ।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘অতীশ দীপংকরের এই মুন্সীগঞ্জ মহৎ মানুষদের জন্ম দেয়। প্রতিবাদী মানুষদের জন্ম দেয়। ইদ্রাকপুর ও বিক্রমপুরের ইতিহাসকে ধারণ করে মুন্সীগঞ্জকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। পদ্মা মেঘনার দাপটে আমরা জানি নদী ভাঙন হচ্ছে। মুন্সীগঞ্জে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন হচ্ছে। চাঁদাবাজি হচ্ছে, সন্ত্রাসী কর্মকা- হচ্ছে। মুন্সীগঞ্জ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায়। মুন্সীগঞ্জে তরুণ, আলেম ও নারীসমাজ এবং শ্রমিক-জনতা লড়াই করেছিল ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারীর বিরুদ্ধে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মুন্সীগঞ্জের হাজারো মানুষ প্রবাসে থাকেন। আমরা সেই প্রবাসীদের ভোটাধিকার দানে কথা বলছি। অনেকেই বলছে প্রবাসীদের কোনো অবদান নেই। মুন্সীগঞ্জবাসী আপনাদের পরিবারদের যেসব সদস্য প্রবাসে থাকে তাদের সচেতন ও সরব হতে বলবেন। তারা বাংলাদেশের অংশ, আমরা তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করব।’
এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘আপনাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে দেশ-বিদেশে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে। আমাদের ফ্যাসিবাদবিরোধী যে রাজনৈতিক দলগুলো রয়েছে, এই ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলমতকে ঐক্যবদ্ধভাবে পরবর্তী বাংলাদেশ বিনির্মাণে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমরা যে সংস্কার চাচ্ছি; সে সংস্কার নির্দিষ্ট কোনো দলের পক্ষেও নয় এবং নির্দিষ্ট কোনো দলের বিপক্ষেও নয়। সংস্কারগুলো হচ্ছে বাংলাদেশের পক্ষে ও জনগণের পক্ষে। আমাদের পরবর্তী বাংলাদেশ কোনো নেতানির্ভর হবে না। পরবর্তী বাংলাদেশ হবে নীতিনির্ভর বাংলাদেশ। এমন বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমাদের সবাইকে এবং তরুণ প্রজন্মকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।’
এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, ‘আমাদের এই বাংলাদেশ পরিপূর্ণ ফ্যাসিবাদমুক্ত তো হয়নি। বরং ফ্যাসিস্টদের দোসরমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ হতে এখনো অনেক পথ বাকি। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে সেই পথ পাড়ি দিতে হবে। আমরা যখন গোপালগঞ্জ যাই, সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশের একটি অংশ গোপালগঞ্জ। কিন্তু আমরা দেখলাম, গোপালগঞ্জ একটি সন্ত্রাসীর আস্তানা হয়ে উঠেছে। যেখানে ফ্যাসিস্টরা থাকবে, সেখানে দলমত নির্বিশেষে প্রতিরোধ করতে হবে।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পর বলেছিলাম বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে পরিবর্তন করতে হবে। এই দেশ যে সিস্টেমে চলে এর পরিবর্তন ঘটাতে হবে। এই সিস্টেমের সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হচ্ছে এই নারায়ণগঞ্জ। যেখানে পরিবারতন্ত্র, মাফিয়াতন্ত্র, গডফাদারতন্ত্র সব মিলেমিশে একাকার ছিল। নারায়ণগঞ্জের যে সিস্টেম এই একই সিস্টেমে পুরো দেশ এতদিন পরিচালিত হয়েছিল। নারায়ণগঞ্জে কয়েকটি পরিবার বছরের পর বছর নিয়ন্ত্রণ করে এসেছিল। এ নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে তারা দখলদারিত্ব করেছে, চাঁদাবাজি করেছে, গুম করেছে, সন্ত্রাসী করেছে। এ মাফিয়া সিস্টেমের সঙ্গে আমরা আর খেলব না। এই মাফিয়াতন্ত্রের বিরুদ্ধে আমরা গণঅভ্যুত্থান করেছিলাম। তাই খেলার নিয়ম বদলাতে হবে। কিন্তু আমরা জানি খেলার নিয়ম এখনো বদলায়নি। নারায়ণগঞ্জে এখনো খেলা বন্ধ হয়নি। এ খেলা বন্ধ করার জন্য আরেকটি গণঅভ্যুত্থানের প্রস্তুতি নেন।’
গতকাল শুক্রবার নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া বিজয় স্তম্ভের সামনে জাতীয় নাগরিক পার্টির পথসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
নাহিদ বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাতে নারায়ণগঞ্জে জুলাই পদযাত্রার তোরণ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সন্ত্রাসীরা আজকের গণজোয়ার বন্ধ করতে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। জুলাই আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জবাসী বুকের রক্ত দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। এদিকে নারায়ণগঞ্জ ওইদিকে সাভার আশুলিয়ায় প্রতিরোধ তৈরি হয়েছিল বলেই ঢাকার মানুষ রাজপথে নেমে আসতে পেরেছিল। তাই আমরা নারায়ণগঞ্জকে শ্রদ্ধা করি। গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে এই নারায়ণগঞ্জের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা প্রতিশ্রুতি দিতে এসেছি। শ্রমিকদের জন্য নারায়ণগঞ্জ বিখ্যাত হলেও তাদের জন্য আমরা এখনো একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি করতে পারিনি। ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা দিতে হবে। অথচ আমরা দেখছি, মাফিয়া অলিগার্কদের প্রোটেকশন দেওয়া হচ্ছে আর ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজদের কারণে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারছেন না।’
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা, যুগ্ম সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল আমিন, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী প্রমুখ।
এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘গত পরশু আমাদের ওপর হামলা হয়েছিল। যারা এই হামলার পক্ষে কথা বলছেন, আওয়ামী লীগের ডেডলিস্টে তারা নেই। আওয়ামী লীগ বলে, তারা ফিরলে তাদের নিয়ে বাংলাদেশ গড়বে। আওয়ামী লীগের ডেডলিস্টে আছি আমরা। আওয়ামী লীগের সঙ্গে আপনাদের ব্যবসাপাতি ছিল, আপনাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক, আওয়ামী লীগের মন্ত্রী কারও কারও মেয়ের জামাই। কিন্তু আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন আমাদের মৃত্যু ডেকে আনবে। আপনি যেভাবে সুশীলতা দেখাতে পারেন, আমি হাসনাত আবদুল্লাহ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সুশীলতা দেখাব না।’
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বাংলাদেশি রাজনৈতিক দল নয়। আওয়ামী লীগ ভারতীয় দল। এ কারণেই তারা বলে ভারতকে যা দিয়েছি ভারত সেটা আজীবন মনে রাখবে। আমরা বলি শুধু তোমাদের জীবদ্দশায় নয়, তোমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যদি ভারতের সেবাদাসত্ব বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখে বাংলাদেশের মানুষ মেনে নেবে না।’
