মুসলিম সমাজে ইহুদি বৈশিষ্ট্যের অনুপ্রবেশ

আপডেট : ২২ জুলাই ২০২৫, ০২:১৬ এএম

মহান আল্লাহ বারবার নবী-রাসুল পাঠিয়ে ইহুদি জাতিকে সত্যের পথে আনতে চেয়েছেন। কিন্তু তারা উগ্রতা, প্রতারণা, মুনাফেকি ও কপটতার মাধ্যমে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছে। কোরআনে ইহুদিদের বিভিন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে, যাতে পরবর্তী যুগের মানুষ তাদের পথ অনুসরণ না করে। এই লেখা কোনো ঘৃণার বশে নয়, বরং নিজেদের আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনে। কারণ কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী ইহুদিদের এসব বৈশিষ্ট্য তখনই অভিশাপ ডেকে আনে, যখন সেগুলো ব্যক্তি, সমাজ বা জাতির চরিত্রে অনুপ্রবেশ করে এবং তারা নিজেদের সংশোধনের চেষ্টা না করে। এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণী তুলে ধরা হলো।

শিরক : ইহুদিরা মহান আল্লাহর অগণিত নেয়ামত, অসংখ্য নবীর শিক্ষা-দীক্ষা লাভ করার পরও সত্য থেকে সরে গিয়ে শিরকের পথে পা বাড়ায়। তারা উজাইর (আ.)-কে আল্লাহর পুত্র বলে দাবি করে এবং নিজেদের ধর্মগুরুদের আল্লাহর সমান মান্য করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ইহুদিরা বলে, উজাইর আল্লাহর পুত্র। তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগীদের রব হিসেবে গ্রহণ করেছে।’ (সুরা তওবা ৩০-৩১) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ ইহুদিদের ধ্বংস করুন, তারা তাদের নবীদের কবরগুলোকে মসজিদে পরিণত করেছে। (সহিহ বুখারি ৪৩৭)

নবীদের বিরোধিতা : তারা তাদের ধর্মগুরুদের পূজা করত এবং তাদের নবী ও নেককারদের বিরোধিতা করত। এমনকি তারা নবীদের হত্যা পর্যন্তও করেছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তাদের ওপর লাঞ্ছনা ও দারিদ্র্য চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং তারা আল্লাহর ক্রোধের পাত্র হয়েছিল। এসব এজন্য যে, তারা আল্লাহর আয়াত অস্বীকার করত এবং অন্যায়ভাবে নবীদের হত্যা করত।’ (সুরা বাকারা ৬১)

এই পরিস্থিতি আমাদের সমাজেও বিদ্যমান। নবীদের শিক্ষা-দীক্ষা ও সৎলোকদের বিরোধিতার এই চিত্র আমাদের সমাজে অহর্নিশ প্রতিফলিত হচ্ছে। আজও যখন কেউ সত্য কথা বলে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করে বা মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকতে চায়, তখন তাকে উপহাস করা হয়। তার বিরোধিতা করা হয়। করা হয় তাকে দেশছাড়া। কথিত ধর্মভীরুরা অনেক সময় প্রকৃত দ্বীনদার ও আলেমদের অপমান করতে উদ্ধত হয়। গিবত করে, দোষ খুঁজে এমনকি তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতেও পিছপা হয় না। কোনো কোনো গোষ্ঠীর হাতে সত্য প্রচারকারীরা আজও লাঞ্ছনা ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছে, যেভাবে ইহুদির হাতে তাদের নবী ও নেককাররা হয়েছিল।

জ্ঞান গোপন ও সত্য বিকৃতি : ইহুদিদের অন্যতম নিন্দনীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা জ্ঞান গোপন করে ও সত্য বিকৃত করে। হাদিসে এসেছে, বনি ইসরাইলকে বলা হয়েছিল, দরজায় সেজদা অবস্থায় প্রবেশ করো এবং বলো ‘হিত্তাতুন (ক্ষমা চাই)’। কিন্তু তারা তা বিকৃত করে বলল, ‘শিষের ভেতরে দানা’ এবং পেছনের দিকে হামাগুড়ি দিয়ে প্রবেশ করল। (সহিহ বুখারি ৩৪০৩) তারা রাসুল (সা.)-এর নবুয়তের বিষয়টি গোপন রাখত। তিনি তাদের বলেছিলেন, তোমরা তাওরাতে যা আছে, তা গোপন করেছ, যা তোমাদের মানুষের কাছে প্রকাশ করতে বলা হয়েছিল।’ (তাফসিরে ইবনে জারির ৬/৩১০)

ইহুদিদের এই জঘন্য বৈশিষ্ট্য আমাদের সমাজকে গ্রাস করেছে। কতক গোষ্ঠী নিজের মনোবাসনা পূরণার্থে দ্বীনের সহিহ ইলমকে গোপন করে রাখে। স্বার্থ উদ্ধারের জন্য অসম্পূর্ণ বিষয় প্রচার করে। মানুষের সামনে সত্য তুলে ধরতে সংকোচবোধ করে। ইসলামের বিধানকে ইচ্ছেমতো বিকৃত করে মানুষের সামনে পেশ করে। কিছু লোক আলেমের মুখোশ পরে গোমরাহি ও ভণ্ডামির বাজার গরম রেখেছে। বাস্তবে তারা ইলম ও মারেফাত থেকে যোজন যোজন দূরে। ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ও আদর্শকে উপেক্ষা করে তারা নিজেদের তৈরি বিকৃত মতাদর্শকেই তুলে ধরে।

বিভক্তি : ইহুদিরা সবসময় ভিন্নমত ও দলাদলিতে লিপ্ত থাকে। বাহ্যিকভাবে তারা ঐক্যবদ্ধ মনে হলেও তাদের অন্তর ছিল বিভেদে ভরপুর। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা তোমাদের সঙ্গে একত্র হয়ে যুদ্ধ করবে না, তবে দুর্গম গ্রামে কিংবা প্রাচীরের আড়াল থেকে (যুদ্ধ করতে পারে)। কারণ তাদের নিজেদের মধ্যেই তো শত্রুতা প্রবল। তুমি মনে করবে তারা একতাবদ্ধ, অথচ তাদের হৃদয় পরস্পর বিচ্ছিন্ন।’ (সুরা হাশর ১৪)

আমাদের সমাজেও আজ বাহ্যিকভাবে অনেককে ঐক্যবদ্ধ মনে হয়। কিন্তু অন্তরে বিভেদ, হিংসা ও দলাদলি প্রবল। একে অপরকে সহ্য করতে পারে না। সুযোগ পেলেই পরস্পরে বিরোধিতায় লিপ্ত হয়, একে অপরকে অপমান করে, পেছনে ষড়যন্ত্র করে। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষ দ্বীনি অঙ্গনেও দলবাজি, হানাহানি, স্বার্থনির্ভর গ্রুপিং ও নেতৃত্ব-বিবাদ ক্রমাগত বাড়ছে। মুখে একতা ও উম্মাহর কথা বলা হলেও বাস্তবে হৃদয়ে রয়েছে বিচ্ছিন্নতা ও আস্থাহীনতা।

অবৈধ সম্পদ ভোগ : ইহুদিরা সবসময় তাদের লক্ষ্য হাসিলের জন্য অবৈধ পথ বেছে নেয়। ঘুষ, প্রতারণা, হারাম উপায়ে অর্থ উপার্জন করে থাকে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা মিথ্যা শুনতে আগ্রহী এবং হারাম খেতে অভ্যস্ত। যদি তারা তোমার কাছে আসে তবে তুমি ন্যায়বিচার করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের পছন্দ করেন।’ (সুরা মায়েদা ৪২)

আমাদের বর্তমান সমাজে লক্ষ্য হাসিল মানেই যেন হারাম পথে হাঁটা। ঘুষ, জালিয়াতি, প্রতারণাসহ সব কিছুতেই লিপ্ত হওয়া। ন্যায়-অন্যায় কেউ ভাবে না, কেবল টাকার জোরে সবকিছু আদায় করে নেওয়ার মানসিকতা সবার মধ্যে প্রবল। হারাম উপার্জনে কারও দ্বিধা নেই, বরং সেটাকেই বুদ্ধিমত্তা ভাবা হয়। যারা ন্যায়বিচার প্রার্থী, তারা আজ উপহাসের পাত্র। সোজা পথে চলা আজ যেন গাধামির নাম! ইমান-আখলাকের কথা বললেই হাসাহাসি ও নাক সিটকে বলে, ‘এ যুগে ওসব চলে নাকি?’ বরং ধোঁকা দিয়ে, ঘুষ খেয়ে, সত্য চাপা দিয়ে কে কত দ্রুত ওপরে উঠতে পারে, তাই নিয়ে চলে প্রতিযোগিতা! ন্যায়ের পথে দাঁড়ানো এখন বিপদ ডেকে আনার নাম, আর বাঁকা পথে সফল হওয়াই যেন বুদ্ধিমানের প্রমাণ! যেন হারামই হয়ে উঠেছে আজকের হালাল!

মুনাফেকি : ইসলামের শক্তি বৃদ্ধির পর মদিনায় কিছু ইহুদি ইসলাম গ্রহণের ভান করত, অথচ তাদের অন্তরে ছিল কপটতা। তারা ছিল মুনাফিক। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যখন তাদের বলা হয়, তোমরা ইমান আনো লোকেরা যেমন ইমান এনেছে। তারা বলে, আমরা কি ইমান আনব নির্বোধরা যেমন ইমান এনেছে? জেনে রাখো, নিশ্চয় তারাই নির্বোধ, কিন্তু তারা জানে না। যখন তারা মুমিনদের সঙ্গে মিলিত হয়, তখন বলে আমরা ইমান এনেছি। আর যখন তাদের শয়তানদের সঙ্গে একান্তে মিলিত হয়, তখন বলে, নিশ্চয় আমরা তোমাদের সঙ্গে আছি। আমরা তো কেবল উপহাসকারী।’

(সুরা বাকারা ১৩-১৪)

আজকাল আমাদের সমাজে অনেকেই মুখে ধর্মের নাম করে, কথা দেয় সৎ ও ন্যায়পরায়ণ হওয়ার, কিন্তু অন্তরে কপটতা আর স্বার্থপরতার গুদাম রাখা। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে কথিত নেতারা পর্যন্ত এমন অনেকেই আছে, যারা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে অন্যের বিশ্বাসকে পুঁজি করে আপন লক্ষ্য পূরণের খেলায় মেতে ওঠে। তারা ভদ্রদের মতো বিশ্বাস জাগায়, মুখে মধুর ভাষণ দেয়, কিন্তু মনের গভীরে চলে অন্য হিসাব। সত্যের পথে দাঁড়ানো তাদের পছন্দ নয়, কারণ সেটি তাদের স্বার্থে বাধা সৃষ্টি করে। আর এই কপটতার ছদ্মবেশেই তারা নিজেদের লক্ষ্য পূরণে নিয়োজিত থাকে।

অন্যায়কে প্রশ্রয় দান : ইহুদিরা সমাজে অনৈতিকতা দেখে চুপ থাকে এবং অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘বনি ইসরাইলের মধ্যে যারা কুফরি করেছিল, তাদের দাউদ ও ঈসা ইবনে মারইয়ামের মাধ্যমে অভিসম্পাত করা হয়েছে। কারণ তারা অমান্য ও সীমালঙ্ঘন করত। তারা পরস্পরকে অন্যায় থেকে নিষেধ করত না।’

(সুরা মায়েদা ৭৮-৭৯)

আমাদের আজকের সমাজেও ইহুদিদের এই বৈশিষ্ট্যের এক ভয়ংকর চিত্র প্রকাশমান। সমাজে রাজত্ব করছে মিথ্যা। দুর্নীতি শেকড় গেড়েছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। স্বাধীনতার নামে জেঁকে বসেছে অশ্লীলতা ও নগ্নতা। কিন্তু এগুলোর বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ কয়জন? কতজন দাঁড়িয়ে বলে, ‘এটা হারাম, এটা অন্যায়, এটা অমানবিক?’ এ বিষয়ে আমাদের কথা বলা দরকার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত