রাজবাড়ীতে বেড়েছে লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব। ছোট বাছুর থেকে সব বয়সের গরুই আক্রান্ত হচ্ছে এই রোগে। লাম্পি স্কিন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বেড়েছে গরুর মৃত্যুহার। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন খামারিরা। বেসরকারিভাবে বিভিন্ন কোম্পানির টিকা বাজারে পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে এর প্রতিষেধক বা টিকা পাওয়া যাচ্ছে না।
চিকিৎসক ও খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লাম্পি স্কিন রোগটিতে হঠাৎ করে একদিনের মধ্যেই গরু আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এই রোগে আক্রান্ত গরুর সারা শরীরে গুটি দেখা যায়। শরীরে জ¦র থাকে। অনেক সময় গরুর পা ফুলে যায়। ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে ফুলে যাওয়া স্থান এবং গুটিগুলোর মধ্যে ঘা দেখা দেয়। এই ঘা ভালো হতে এক মাসেরও বেশি সময় লাগে। এই রোগে আক্রান্ত গরুগুলো শুকিয়ে যায়। দুধের গাভীর দুধ উৎপাদন কমে যায়। গাভীর গর্ভধারণের ক্ষেত্রেও এই রোগের প্রভাব পড়ে। সাধারণত কম বয়সী গরু বা দুধের বাছুর এই ভাইরাসে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এখন পর্যন্ত এই রোগের তেমন কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি বের হয়নি। তবে ঘরোয়া পদ্ধতিতে চিকিৎসা দিলে আক্রান্ত গরুগুলো দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার পাঁচটি উপজেলায় মোট গরুর খামার রয়েছে ১৫ হাজার ১৭২টি। এর মধ্যে নিবন্ধিত গাভীর খামারের সংখ্যা ১৭৮টি এবং অনিবন্ধিত গাভীর খামারের সংখ্যা ৮ হাজার ৭৯২টি। নিবন্ধিত গরু হৃষ্টপুষ্টকরণ খামার রয়েছে ১৯টি আর অনিবন্ধিত খামার রয়েছে ৬ হাজার ১৮৩টি। জেলায় মোট গরু রয়েছে দুই লাখ ১৭ হাজার ৬২৮টি।
রাজবাড়ী সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা উমর ফারুক বলেন, লাম্পি স্কিন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন গড়ে সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে ৩০ থেকে ৪০টি গরু চিকিৎসা নিতে আসে। এখন আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমে এসেছে। খামারিদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। অনেকেই এই ভাইরাস দমনে গরুকে ভ্যাকসিন প্রদান করেছেন।
চরলক্ষ্মীপুর গ্রামের খামারি আবজাল শেখ বলেন, তার খামারে ১৪টি গরু রয়েছে। বড় গরুগুলোকে ১০ মাস আগে এলএসডি ভাইরাস রোগের টিকা দিয়েছিলেন। এর পরে চারটি বাছুরের জন্ম হয়েছে। এদের মধ্যে একটি বাছুর লাম্পি স্কিনে আক্রান্ত হয়েছে। এক মাস আগে এই বাছুরটি আক্রান্ত হয়েছে। সারা শরীরে কোথাও একটু ফাঁকা জায়গা নেই। দুই পা ফুলে গেছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে এই বাছুরটি দাঁড়িয়ে ছিল। এখন একটু সুস্থ হয়েছে। তবে সারা শরীরে অনেক ঘা বের হয়েছে। এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে বাছুরটি অনেক শুকিয়ে গেছে। বাছুরটি বেঁচে থাকলেও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে কমপক্ষে ২০ হাজার টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তিনি।
সদর উপজেলার রামকান্তপুর গ্রামের বাসিন্দা দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস লাম্পি ভাইরাসে আক্রান্ত দুই মাসের একটি বাছুর নিয়ে রাজবাড়ী সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে যান। এ সময় দুলাল চন্দ্র বলেন, তার বাড়িতে ছোট-বড় চারটি গরু রয়েছে। এর সবগুলোকে এই লাম্পি স্কিন ডিজিজের টিকা দিয়েছেন। কিন্তু তারপরও এই বাছুরটি আক্রান্ত হয়েছে। দুদিন ধরে খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। গলার নিচে একটি বড় ধরনের ফোলা ভাব দেখা দিয়েছে। বাছুরটি নিয়ে তিনি এখন অনেক চিন্তিত রয়েছেন।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, লাম্পি স্কিন ডিজিজ ভাইরাসটি সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। রাজবাড়ীতেও অনেক গরু এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। সাধারণত বর্ষার শুরুতে এই রোগের প্রার্দুভাব বাড়ে। মশা, মাছি ও আঁঠালি এই রোগের প্রধান বাহক। সব বয়সী গরুই এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তবে বাছুর গরু আক্রান্তের সংখ্যা একটু বেশি। আর বাছুরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বড় গরুর চেয়ে একটু কম। এই ভাইরাস আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গেই চিকিৎসা ও পর্যাপ্ত যতœ নিলে বেশিরভাগ গরুই সুস্থ হয়ে যায়। সরকারিভাবে এই রোগের টিকা এখন পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বেসরকারি কিছু কোম্পানির টিকা বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। নিয়মিত টিকা প্রদান করলে এবং একটু সচেতন হলে এই রোগের উপদ্রব কমানো সম্ভব।
