দ্বিতীয় যুদ্ধের পথ খুঁজছে ইসরায়েল

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৫, ০৮:২১ এএম

ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের সাম্প্রতিক যুদ্ধকে সফল বলে মনে করছে ইসরায়েল। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পাশাপাশি যুদ্ধে ইরানের কয়েকজন শীর্ষ সেনা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের পরমাণু স্থাপনা ফোর্দোতে হামলায় অংশ নিতে রাজি করানো গেছে। যুদ্ধের পর ইসরায়েল বিজয়ের দাবি করলেও প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, প্রয়োজনে আবারও হামলার জন্য তারা প্রস্তুত। বিশ্লেষকরা আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, ইসরায়েল ইতিমধ্যে ইরানকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে আরও একটি বড় সংঘাতের উপযুক্ত সুযোগের সন্ধান করছে। তবে পুনরায় হামলা চালাতে হলে ইসরায়েলের যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। আর ওয়াশিংটন আদৌ সেই অনুমোদন দেবে কি না, তা অনিশ্চিত।

গত জুনের মাঝামাঝি সময়ে ইসরায়েলের আকস্মিক হামলা থেকে শুরু হয়েছিল যুদ্ধ, যাতে এক হাজারের বেশি ইরানি ও ২৯ জন ইসরায়েলি নিহত হন। ইসরায়েলের দাবি, তারা ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করতে আত্মরক্ষার অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। যদিও তেহরান বরাবরই বলে আসছে, তাদের কর্মসূচি বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান জানান, চলমান এই যুদ্ধবিরতি টেকসই নয়। তিনি বলেন, ইসরায়েল আবার কোনো হামলা চালালে আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আমাদের সেনাবাহিনী আবারও ইসরায়েলের গভীরে আঘাত হানতে পারবে।

সংঘাতের পেছনের কারণ : ইসরায়েল কেবল ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল বলে  দাবি করলেও বাস্তবে ইরানের উচ্চপর্যায়ের সরকারি ও সামরিক নেতাদের লক্ষ্যবস্তু করেছে। বিশ্লেষকদের মতে এতে বোঝা যায় ইসরায়েল শুধু প্রতিরক্ষা নয়, বরং ইরানি শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করতে চায়। ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও থিংকট্যাংক কুইন্সি ইনস্টিটিউটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ত্রিতা পার্সি বলেন, ইসরায়েল চায় ইরানকে সিরিয়া বা লেবাননের মতো একটা দেশে পরিণত করতে  যাকে জবাবদিহি ছাড়াই যখন খুশি আঘাত হানা যায়।

ইউরোপীয় দেশগুলো যদি আবার ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাহলে ইসরায়েলের সামনে আবার যুদ্ধের সুযোগ আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এতে সিদ্ধান্ত হয়, আগস্টের মধ্যে কোনো নতুন পরমাণু চুক্তি না হলে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাগুলো আবার কার্যকর হবে। ২০১৫ সালে ইরান ও কয়েকটি পশ্চিমা দেশের মধ্যে পরমাণু চুক্তি হলে এসব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। তবে ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়ে আবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

অজুহাত তৈরির প্রস্তুতি : এখন যদি ইউরোপও সেই পথ অনুসরণ করে, তাহলে ইরান পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি থেকেও বেরিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আর এটাই ইসরায়েলের জন্য আবার হামলার সুযোগ তৈরি করতে পারে। ইসরায়েলের রাইখম্যান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানবিষয়ক অধ্যাপক মেইর জাভেদানফার বলেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি পুনর্গঠনের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ হাজির না করলে দেশটিতে ইসরায়েলের পক্ষে হামলা চালানো কঠিন হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সিরিয়ায় ইসরায়েলের আগ্রাসন নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগের কারণে ইরানে আবার হামলা চালাতে ট্রাম্পের অনুমতি পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা : যুদ্ধ শুরুর সম্ভাবনা ততটা ঘনীভূত না হলেও, তিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও এক ইউরোপীয় কূটনীতিকের বরাতে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ইসরায়েল ইতিমধ্যেই ইরানে গোপন অভিযান চালাচ্ছে। সম্প্রতি দেশটিতে ফ্ল্যাট, তেল শোধনাগার, বিমানবন্দরের পাশে ও জুতার কারখানায় আগুন বা বিস্ফোরণের পেছনে ইসরায়েলের হাত রয়েছে। ওয়াশিংটনের থিংকট্যাংক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির বিশ্লেষক নেগার মরতাজাভি বলেন, নেতানিয়াহু এমন একটা কৌশল বের করেছেন যাতে ট্রাম্পের আপত্তি সত্ত্বেও ইরানে নির্বিঘ্নে হামলা চালানো সম্ভব হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল ইরানের অভ্যন্তরে যেভাবে গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, তাতে তারা স্থানীয় এজেন্ট ও ড্রোন ব্যবহার করে সহজেই অভিযান চালাতে পারছে। ইরানবিষয়ক বিশ্লেষক ওরি গোল্ডবার্গ বলেন, ইসরায়েল ইরানে একটি সুসংগঠিত নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। যুদ্ধ শেষ হলেও ইরানে সেই গুপ্ত নেটওয়ার্ক এখনো সক্রিয় আছে। পাশাপাশি ইরানের নতুন অভিযান নেতানিয়াহুর ইসরায়েলের অভ্যন্তরে সৃষ্ট বিভাজন থেকে চোখ সরানোর কৌশল হতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এবার ইরান আর অসতর্ক থাকবে না। মরতাজাভি আল-জাজিরাকে বলেন, ইসরায়েল যে আগ্রাসন অব্যাহত রাখবে, তা ইরান জানে। তবে সেই সঙ্গে তারা এখনো কূটনৈতিকভাবে পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছার আশাও করে যাচ্ছে। এই বিশ্লেষক বলেন, তারা জানেন কোনো চুক্তি হলে ইসরায়েলের আক্রমণের আশঙ্কা অনেকটাই কমে যাবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত