গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হৃদয়ের মরদেহ মেলেনি এক বছরেও

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৫, ১২:৫৭ এএম

গত বছরের ৫ আগস্ট গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে পুলিশের গুলিতে কলেজছাত্র হৃদয় নিহত হওয়ার এক বছরেও তার মরদেহ পাওয়া যায়নি। নামও ওঠেনি শহীদদের তালিকায়। সন্তান হারিয়ে শোকে পাগলপ্রায় হৃদয়ের বাবা-মা। এক বছর পর এখন ছেলের হাড়গোড় ফিরে পেতে চান তারা।

ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর আনন্দ মিছিলে অংশ নিয়ে গুলিতে নিহত হন হৃদয়।

হৃদয়ের বাড়ি টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার আলমনগর গ্রামে। হৃদয় ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তিনি হেমনগর ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণিতে পড়তেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি কোনাবাড়ীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালাতেন তিনি। তার পাঠানো টাকায় কোনোরকমে চলত সংসার। হৃদয় শহীদ হওয়ার পর তার ভ্যানচালক বাবা আর ঠিকমতো কাজ করতে পারেন না। এনজিওর ঋণ পরিশোধ না করতে পেরে আরও সংকটে পড়েছে পরিবারটি।

হৃদয়ের ভগ্নিপতি মো. ইব্রাহিম বলেন, ৫ আগস্ট সকাল থেকেই হৃদয় ও তিনি আন্দোলনে অংশ নেন। ওই দিন শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর তারা সবাই আনন্দ মিছিলে অংশ নেন। মিছিলটি কোনাবাড়ী থানার কাছে পৌঁছালে থানার ভেতর থেকে পুলিশ গুলি ছুড়তে থাকে। একপর্যায়ে পুলিশ মিছিলে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালায়। তখন তারা হৃদয়কে গুলি করে লাশ গুম করার উদ্দেশে একটি গলিতে নিয়ে যায়। এ ঘটনার একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে কনস্টেবল আকরামকে কিশোরগঞ্জ থেকে গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ ঘটনায় হৃদয়ের ভগ্নিপতি মো. ইব্রাহীম বাদী হয়ে কোনাবাড়ী থানায় হত্যা মামলা করেন।

হৃদয়ের মরদেহের সন্ধানে তুরাগে ডুবুরি দল : শহীদ হৃদয়ের মরদেহ উদ্ধারে গত বৃহস্পতিবার গাজীপুর মহানগরীর কড্ডা ব্রিজ এলাকায় তুরাগ নদীতে তিন কিলোমিটার এলাকা জুড়ে অভিযান চালিয়েছে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল। উদ্ধার অভিযান চলাকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার তদন্তকারী কর্মকর্তা মাসুদ পারভেজসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

গাজীপুর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক মোহাম্মদ মামুন জানান, ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত উদ্ধারকাজ চালান।

হৃদয়ের বড় বোন জেসমিন আক্তার বলেন, ‘হৃদয় ছিল আমাদের একমাত্র ছোট ভাই। আমাদের অভাবের সংসারে সে কষ্ট করে লেখাপড়া করত। লাশ পাওয়া যায়নি বলে আমার ভাই শহীদের মর্যাদা পায়নি। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতা পাইনি।’

হৃদয়ের মা-বাবা কান্নাজড়ানো কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা শুধু আমাদের ছেলের হাড়গোড় ফেরত চাই। আর যারা এই হত্যাকা- ঘটিয়েছে, তাদের ফাঁসি চাই। অন্তত শহীদদের তালিকায় যেন হৃদয়ের নাম ওঠে।’

ইব্রাহিম বলেন, ‘এক বছর পর সরকার হৃদয়ের লাশ উদ্ধারের জন্য তুরাগ নদীতে কাজ করেছে। যদি তার একটি হাড়ও পাই তাহলে সেটি নিয়ে পরিবারের সবাইকে সান্ত¡না দিতে পারব। বাড়ির পাশে একটি কবর দিতে পারব।’

এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গাজীপুর মেট্রোপলিটন গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) উত্তরের ওসি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘মামলায় এ পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে যে ব্যক্তিগত গাড়িতে করে হৃদয়ের লাশ তুরাগ নদীতে ফেলা হয়েছে সেই গাড়ির চালক রহিম (২৭) আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এরই অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার তুরাগ নদীতে অভিযান চালানো হয়েছে। আশা করছি খুব দ্রুত হৃদয়ের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত