নিহত শিক্ষিকার স্বামী

মাহেরীন তার কাজের মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৫, ০৭:৩৪ এএম

রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোনে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে নিহত শিক্ষিকা মাহেরীন চৌধুরীর স্বামী মনসুর হেলাল বলেছেন, আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছুই নেই। আমার সাহসী স্ত্রী ২০ জন কোমলমতি শিক্ষার্থীর জীবন বাঁচিয়ে নিজের জীবন বিলিয়ে আজ কবরে শায়িত। আমি মনে করি মাহেরীন চৌধুরী রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে যে দায়িত্ব পালন করেছে, তার ভিত্তিতে রাষ্ট্র যদি মনে করে, তবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি তারা বিবেচনা করবে। তবে সারা দেশের মানুষ আমার স্ত্রীকে যে সম্মান দিয়েছে এটি ইতিহাস হয়ে থাকবে। গতকাল বেলা ১১টার দিকে নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার বগুলাগাড়ী গ্রামে স্ত্রীর কবর জিয়ারত শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, মাহেরীন তার কাজের মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে। জীবদ্দশায় এমন ঘটনা ঘটলে হয়তো তিনি নিজেই কিছু বলতে পারতেন। এখন আর বলার কিছু নেই।

দুই সন্তানের কথা উল্লেখ করে মনসুর হেলাল বলেন, ওদের জীবনটা শুধু শুরু হয়েছিল। ওদের মা ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি। এখন সেই মানুষটি নেই। আপনারা ওদের জন্য দোয়া করবেন, যেন ওরা তাদের মায়ের রেখে যাওয়া সম্মান ধরে রাখতে পারে। বিমান দুর্ঘটনায় নিহত অন্যদের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, মাহেরীনের সঙ্গে যারা শহীদ হয়েছে সেই নিষ্পাপ শিশুগুলো ও অন্য শিক্ষকদের জন্যও আমাদের পক্ষ থেকে গভীর দোয়া রইল। আল্লাহ যেন সবাইকে জান্নাত নসিব করেন। পাশাপাশি যারা আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে তাদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন তিনি। মাহেরীনের বড় ছেলে আয়ান রহীদ মিয়াদ চৌধুরী বলেন, অগ্নিদগ্ধ হয়েও মা নিজে শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আমার ছোট ভাই-বোনদের বাঁচাতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন। আপনাদের সবার কাছে আমার মায়ের আত্মার শান্তির মাগফিরাতে দোয়া করবেন। মা আমাদের দুই ভাইকে যে আদর্শের শিক্ষা দিয়েছেন, তা যেন আমরা লালন-পালন করতে পারি এই দোয়া করবেন। ছোট ছেলে আদিল রহীদ মাহিব চৌধুরী বলেন, একজন শিক্ষক শুধু ক্লাসরুমে নয়, সমাজের ক্লাসেও অনেক কিছু শিখিয়ে যায়। যার বাস্তব উদাহরণ হচ্ছে আমার মা মাহেরীন চৌধুরী। আপনারা আমার মায়ের জন্য ও আমাদের জন্য দোয়া করবেন।

গত ২১ জুলাই উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ক্লাস চলাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একটি ভবনে প্রশিক্ষণ বিমান আছড়ে পড়ে। মুহূর্তেই আগুন ধরে যায় ভবনে। ধোঁয়া আর আতঙ্কে চারপাশ যখন হাহাকার, তখনো শিশু শিক্ষার্থীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে ব্যস্ত ছিলেন শিক্ষিতা মাহেরীন চৌধুরী। ২০ শিশুর জীবন রক্ষা করে, শেষে তিনি নিজেই আগুনে আটকে পড়েন। শরীরের অধিকাংশ দগ্ধ হয় তার। তাকে গুরুতর অবস্থায় নেওয়া হয় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। রাত পৌনে ১০টায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মাহেরীর চৌধুরীর স্বামী কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার মনছুর হেলাল। দুই ছেলের মধ্যে আয়ান রহীদ মিনাদ চৌধরী ও-লেবেল শেষ করেছেন। ছোট ছেলে আদিল রহীদ মাহিন চৌধুরী ও-লেবেল দেবে। এদিকে ২৪ জুলাই প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের নিয়মিত বৈঠকে উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত দুই শিক্ষককে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

অন্য নিহত শিক্ষিকা হলেন মাসুকা বেগম নিপু। তাকে তার বড় বোনের শ্বশুরবাড়ির গ্রামে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার সোহাগপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলা চিলোকুট গ্রামের চৌধুরী বাড়ির সিদ্দিক আহমেদের মেয়ে। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে মাসুকা সবার ছোট। তার মা মারা গেছেন ১৫ বছর আগে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত