আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সেনাবাহিনীর মেজর সাদেকুল হক সাদেক ট্রেনিং দিচ্ছে কি না, তা তদন্ত করে জানানো হবে বলে জানিয়েছেন সেনা সদরের মিলিটারি অপারেশনস ডিরেক্টরেটের (কর্নেল স্টাফ) কর্নেল মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, বিষয়টি তদন্তাধীন। তদন্ত চলাকালে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য নয়। তদন্ত শেষে বিষয়টি জানানো হবে। তা ছাড়া এনসিপির কোনো নেতাকে নিরাপত্তা দেয়নি সেনাবাহিনী। সংঘর্ষ চলাকালে গোপালগঞ্জে কোনো প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকা সেনানিবাসের অফিসার্স মেসে সেনা সদরের উদ্যোগে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন শফিকুল ইসলাম।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মিলিটারি অপারেশনস পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাজিম-উদন্ডদৌলা, আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পরিচালক লে. কর্নেল সামি-উদন্ডদৌলা চৌধুরী, সহকারী পরিচালক রাশেদুল ইসলাম প্রমুখ।
কর্নেল মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ভালোভাবেই সেনাবাহিনী কাজ করে যাচ্ছে। ক্যাম্পগুলো থেকে আভিযানিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেনাবাহিনী এনসিপির কোনো নেতাকে নিরাপত্তা দেয়নি। শুধু এনসিপি নয়, কোনো দলকেই নিরাপত্তা দেওয়া হয়নি। যাদের জীবনের হুমকি রয়েছে বা জনজীবনে বিশৃঙ্খলা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাদেরই নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, চিহ্নিত সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার ও অস্ত্র, গোলাবারুদ উদ্ধার অভিযানে গত চার সপ্তাহে সেনাবাহিনী ৩৭টি অবৈধ অস্ত্র ও ১৭৯ রাউন্ড গোলাবারুদ এবং গত বছরের আগস্ট থেকে এই পর্যন্ত ১২ হাজার ১১৯টি হারানো অস্ত্রের মধ্যে ৯.৭২৯টি অস্ত্র ও ৩ লাখ ৯০ হাজার ৯৭৫ রাউন্ড হারানো গোলাবারুদের মধ্যে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৩৩ রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ১৬ হাজার ৪৫৯ জন এবং চার সপ্তাহে ৮১৩ জনকে সেনাবাহিনী গ্রেপ্তার করেছে। যাদের মধ্যে কিশোর গ্যাং, তালিকাভুক্ত অপরাধী, ডাকাতসহ অন্যান্য অপরাধী রয়েছে। তা ছাড়া সারা দেশে মাদক ও চাঁদাবাজির অভিযোগে ৫ হাজার ৫৭৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শফিকুল ইসলাম বলেন, ৩ থেকে ৩১ জুলাই সময়কালে পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিচালিত অভিযানে ১০টি আগ্নেয়াস্ত্র ২০১০টি এসএমজি, ৩০টি দেশীয় রাইফেল, ৩টি পিস্তল, ১টি শটগান, ২টি স্থানীয়ভাবে তৈরি আগ্নেয়াস্ত্র, ৯ রাউন্ড অ্যামোনিশন, ৬৫টি এফসিসি, অস্ত্রের খুচরা যন্ত্রপাতি, ৫০০ গ্রাম গান পাউডার, ৭টি ওয়াকিটকি সেট, মাদকসহ অন্য সরঞ্জাম উদ্ধার হয়েছে। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাতজন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করে। তার মধ্যে তিনজন ইউপিডিএফের (মূল) সদস্য, দুজন ইয়াবা কারবারি এবং আরও দুজন বিচ্ছিন্ন অপরাধী রয়েছে। ২৯ জুলাই বাঘাইহাট এলাকায় ইউপিডিএফ (মূল) দলের বিরুদ্ধে একটি অভিযানে একটি এসএমজি, তিনটি দেশীয় রাইফেল, একটি পিস্তল এবং পাঁচটি ওয়াকিটকিসহ বিপুলসংখ্যক সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। ৩০ জুলাই বান্দরবানের রুমা জোনের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় একটি অভিযান পরিচালনা করা হয় এবং কেএনএ কর্তৃক পরিত্যক্ত একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ধ্বংস করা হয়। আধিপত্য বিস্তারের অংশ হিসেবে জেএসএস (মূল) ও ইউপিডিএফের (মূল) মধ্যে গুলিবিনিময় হয় ও তিনটি গ্রেনেড বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। তিনি জানান, জুলাই অভ্যুত্থানে আহতদের সুচিকিৎসা প্রদানে সেনাবাহিনী অদ্যাবধি ৪ হাজার ৮৮৯ জনকে দেশের বিভিন্ন সিএমএইচে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। এখনো সিএমএইচ ঢাকায় ২৯ জন চিকিৎসাধীন। ২১ জুলাই রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হলে সেনা সদস্যরা অত্যন্ত আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করে। ওই দুর্ঘটনায় আহত ১৪১ জনকে সিএমএইচ ঢাকায় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। যাদের ১১ জন এখনো সিএমএইচএ চিকিৎসাধীন। উদ্ধার কার্যক্রমে নিয়োজিত সেনাবাহিনীর ১৯ জন সদস্য শারীরিকভাবে আহত হন এবং বর্তমানে একজন সেনা সদস্য সিএমএইচে চিকিৎসাধীন। গত ২২ জুলাই এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বিক্ষুব্ধ জনতা সচিবালয়ের সামনে আন্দোলনের জন্য অবস্থান করে এবং উত্তেজিত জনতা গেট ভেঙে সচিবালয়ের ভেতরে ঢোকে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন এবং তাদের বাধা দিলে তারা সেনা সদস্যদের ওপর চড়াও হন। এতে পাঁচজন সেনা সদস্য আহত হন, যাদের সচিবালয়ের ভেতরের ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। পরে সিএমএইচ ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়।
শফিকুল ইসলাম বলেন, গত ১২, ১৮ এবং ১৯ জুলাই সিলেট জেলার বিভিন্ন স্থানে চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ প্রসাধনীসামগ্রী, পোশাক ও কফি জব্দ করা হয়। বিআরটিএ এলাকায় দালাল চক্র দমনে সেনাবাহিনী গত ১৪ জুলাই বিআরটিএ ঢাকার পূর্বাচলে এ অভিযান পরিচালন করে জনসাধারণের কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স তৈরিতে সহায়তার অভিযোগে চারজন দালালকে আটক করেছে। ভেজাল খাদ্যদ্রব্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও কারখানায় বিশেষ অভিযান পরিচালনার অংশ হিসেবে গত ১৬ জুলাই উত্তরখান এলাকায় ভেজাল খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত একটি প্রতিষ্ঠান তাকদীর ফুড বেভারিজকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও সিলেটের ‘বয়াল সøাইস’ নামক রেস্টুরেন্টকে ১ লাখ টাকা জরিমানাসহ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। অবৈধভাবে নদী থেকে বালু ও পাথর উত্তোলন প্রতিরোধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভিযানের অংশ হিসেবে গত এক মাসে সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলা থেকে ৩৪টি নৌকা, ৭টি বাল্কহেড, ৫টি ড্রেজার মেশিন, ১টি পিকআপ এবং ৬০ হাজার ৫০০ সিএফটি বালু উদ্ধার করা হয় এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৯৬ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
