স্বাধীন ও পূর্ণ সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হলে অস্ত্র ত্যাগ করবে না হামাস। শনিবার এক বিবৃতিতে এই ঘোষণা দেয় স্বাধীনতাকামী এই সশস্ত্র গোষ্ঠী। আর জিম্মিরা মুক্ত না হলে গাজায় যুদ্ধ চলবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইসরায়েলি সেনাপ্রধান ইয়াল জামির। এদিকে, অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ফিলিস্তিনের পক্ষে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। গতকাল রবিবার সিডনির হারবার ব্রিজে এই বিক্ষোভে প্রায় ৩ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছে বলে জানিয়েছে আয়োজকরা। ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় অস্ত্র ব্যবহার ঠেকাতে ইসরায়েলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার ঘোষণা দিয়েছে কানাডা। মূলত গাজায় যেকোনো ধরনের সামরিক ব্যবহারযোগ্য পণ্য রপ্তানি বন্ধে দেশটি তার অবস্থান পুনরায় স্পষ্ট করেছে। এদিকে, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফের হামলায় ৩৮ ত্রাণপ্রত্যাশীসহ প্রাণ গেছে ৬৯ জনের। অনাহারে মৃত্যু হয়েছে আরও ৬ ফিলিস্তিনির।
চলতি সপ্তাহে ইসরায়েল সফর করেন ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। এ সময় যুদ্ধবিরতি আলোচনায় হামাস অস্ত্রসমর্পণে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে দাবি করেন স্টিভ উইটকফ। তবে, উইটকফের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে হামাস জানায়, স্বাধীন ও পূর্ণ সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হলে অস্ত্র ত্যাগ করবে না তারা। হামাসের দাবি, ইসরায়েল যদি সত্যিকার অর্থে স্থায়ী শান্তি চায়, তবে প্রথমে ফিলিস্তিনি জনগণের রাষ্ট্র গঠনের অধিকার স্বীকার করতে হবে। গত মাসে ভেস্তে যায় জিম্মিদের মুক্তি ও যুদ্ধবিরতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, মিসর ও কাতারের মধ্যস্থতায় চলা আলোচনা। সেইসঙ্গে জোরালো হয় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফের হত্যাযজ্ঞ। তীব্র খাদ্যসংকটে গাজায় দীর্ঘ হচ্ছে অনাহারে প্রাণহানির তালিকা। গাজার এক-তৃতীয়াংশ ফিলিস্তিনি খাদ্যহীন অবস্থায় দিনের পর দিন পার করছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। ইউনিসেফের মানবিক ত্রাণ ও সরবরাহ বিভাগের উপ-নির্বাহী পরিচালক টেড চাইবান জানান, গাজার পুষ্টিহীনতার মাত্রা এখন দুর্ভিক্ষ সূচক ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে গাজায় ৩ লাখ ২০ হাজারের বেশি শিশু চরম পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে জিম্মিরা মুক্ত না হলে গাজায় বিরতিহীনভাবে যুদ্ধ চলবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইসরায়েলি সেনাপ্রধান ইয়াল জামির। এ সময় আবারও গাজার সাধারণ মানুষের মৃত্যু ও দুর্ভোগের জন্য হামাসকে দায়ী করেন তিনি। সেইসঙ্গে আইডিএফের বিরুদ্ধে ওঠা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ ভিত্তিহীন বলেও দাবি তার।
এদিকে, অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ফিলিস্তিনের পক্ষে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। রবিবার সিডনির হারবার ব্রিজে এই বিক্ষোভে অন্তত ৯০ হাজার জনতা অংশ নিয়েছে বলে ধারণা পুলিশের। তবে আয়োজকরা বলছে, এই বিক্ষোভে প্রায় ৩ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছে। উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ফিলিস্তিনের পক্ষে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। গার্ডিয়ান বলছে, বেলা সাড়ে ১১টায় এই মিছিলের কারণে সিডনি হারবার ব্রিজ বন্ধ হয়ে যায়। ফিলিস্তিনের গাজায় অপুষ্টি ও মানবিক সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও সমালোচনা বাড়ার প্রেক্ষিতে সম্প্রতি ফ্রান্স, ব্রিটেন ও কানাডা কিছুটা শর্তসাপেক্ষে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে। অস্ট্রেলিয়া গাজায় যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানালেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়নি। তবে মঙ্গলবার অস্ট্রেলিয়া এক ডজনের বেশি দেশের সঙ্গে এক যৌথ বিবৃতিতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার ‘ইচ্ছা বা ইতিবাচক বিবেচনা’ প্রকাশ করেছে। একে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা ঝড়ো বাতাস ও বৃষ্টির মধ্যেও হারবার সেতু পার হন এবং ‘অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি’, ‘ফিলিস্তিন মুক্ত হোক’ স্লোগান দিতে থাকেন।
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় অস্ত্র ব্যবহার ঠেকাতে ইসরায়েলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার ঘোষণা দিয়েছে কানাডা। এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেন কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিতা আনন্দ। তিনি বলেন, গাজায় ব্যবহৃত হতে পারে এমন সামরিক পণ্যের লাইসেন্স আমরা ২০২৪ সালের শুরুতেই স্থগিত করেছি এবং এখনো তা স্থগিতই রয়েছে। গত ২৯ জুলাই প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, কানাডা থেকে ইসরায়েলে এখনো অস্ত্র যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে আনিতা বলেন, প্রতিবেদনের বেশ কিছু দাবি বিভ্রান্তিকর এবং বাস্তবতা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফের হামলায় ৩৮ ত্রাণপ্রত্যাশীসহ প্রাণ গেছে ৬৯ জনের। অনাহারে মৃত্যু হয়েছে আরও ৬ ফিলিস্তিনির। যার মধ্যে রয়েছে আতেফ আবু খাতের নামে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর, যে স্থানীয়ভাবে খেলাধুলায় চ্যাম্পিয়ন ছিল। কিন্তু খাবার খেতে না পারায় তার ওজন কমে যায়। প্রচণ্ড অপুষ্টিতে ভোগার পর অবশেষে সে মারা যায়। এ নিয়ে গাজায় অনাহারে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ১৭৯ জনে, যার মধ্যে ৯৩ জনই শিশু।
