চারদিকে শুধু পানি আর পানি। রাস্তা, রান্নাঘর, গোসলখানা, টয়লেট, উঠান—কোথাও হাঁটার উপায় নেই। হাঁস-মুরগির খোয়ার থেকে ঘরের ভেতর পর্যন্ত থৈ থৈ পানি। যেন পুরো গ্রামটাই এক বিশাল জলাশয়।
কুমিল্লা শহরের উপকণ্ঠে, পাঁচথুবী ইউনিয়নের ঘনবসতিপূর্ণ চাঁনপুর গ্রাম। কান্দিরপাড় থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরের এ গ্রামে বাস অর্ধলক্ষাধিক মানুষের। সিটি করপোরেশনের বাইরে হওয়ায় বছরের পর বছর অব্যাহত জলাবদ্ধতা নিয়ে প্রশাসনের তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। বর্ষা এলে পানি জমে থাকে বছরের পর বছর। এর জেরে দেখা দেয় চর্মরোগ, ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগ। সংকট দেখা দেয় খাবার পানিতেও।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কুমিল্লা শহরতলীর চানপুর এলাকা পড়েছে পাঁচথুবি ইউনিয়নে। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে এখানকার অর্ধলক্ষাধিক মানুষ জলাবদ্ধতার সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। অপরিকল্পিত বাড়ি নির্মাণ এবং পুরানো গোমতী নদীতে বাঁধ দিয়ে মাছের ঘের করায় পানি নিষ্কাশনের সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। বর্ষায় জমে যাওয়া পানি শুকাতে পরের বছরের বর্ষা চলে আসে। চলতি বর্ষায় তাদের ভোগান্তি কয়েকগুণ বেড়েছে। দীর্ঘ জলাবদ্ধতার কারণে এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রভাব পড়েছে। কমে গেছে যান চলাচল। কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নিতে বেগ পেতে হয়। রাত হলে বাড়ে বিষাক্ত সাপের ভয়। প্রশাসন জানিয়েছে, চানপুরের বাসিন্দাদের জলাবদ্ধতা ভোগান্তির বিষয়টি নজরে এসেছে। সমস্যা সমাধানে প্রকৌশল বিভাগ ও স্থানীয় চেয়ারম্যানকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, চানপুর এলাকাটি সিটি করপোরেশনের বাইরে হলেও এটি কুমিল্লা শহরের পুরোনো আবাসিক এলাকা। পুরোনো গোমতী নদীর দুই আইলের মাঝে গড়ে ওঠা এ অঞ্চলটি খুবই ঘনবসতিপূর্ণ। বহুতল ভবনসহ কাঁচা-আধাপাকা বাড়িতে বসবাস করা এই এলাকায় প্রায় সবাই স্থায়ী বাসিন্দা।
রাস্তার ওপর কচুরিপানা জমে এমন অবস্থা হয়েছে সেটি রাস্তা-নালা নাকি জলাশয়-বোঝারও উপায় নেই। প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি সব জায়গায় ময়লাপানি।
এ বিষয়ে রুবিনা আক্তার বলেন, এ সমস্য চাঁনপুর এলাকায় বিগত কয়েক বছরের। একবার বর্ষার পানি জমলেই বছরের বেশিরভাগ সময় বাড়িঘর রাস্তাঘাট ডুবে থাকে। পানি সরার কোনো জায়গা নেই। ঘরে ঘরে চর্মরোগ, খাবার পানির ভয়ানক সমস্যা। বাথরুম-টয়লেটও পানির নিচে। এই অবস্থায় থাকা যায় না! আমরা আসলেই নিরুপায় হয়েই নিজের বাড়িঘরে থাকছি, সামর্থ থাকলে কবে চলে যেতাম!।
স্থানীয় বাসিন্দা বিল্লাল হোসেন বলেন, চাঁনপুর এলাকাটি কুমিল্লা শহরের অন্যতম পুরাতন আবাসিক এলাকা। কিন্তু সিটি করপোরেশনের সীমানার বাইরে পড়ে যাওয়ায়, এলাকাটি যেন বাতির নিচে অন্ধকারের মত। আগে শুধু রাস্তাঘাট ডুবে থাকত। এখন বাড়িঘরও ডুবে গেছে। এই সমস্যা প্রায় ৩০ বছর ধরেই, দিন দিন বাড়ছেই।
তিন আরও বলেন, সবাই পরিকল্পনা ছাড়া বাড়িঘর করেছে, আর এই চাঁনপুরের পূর্বদিক দিয়ে টিক্কারচর এলাকায় পানি অপসারণের জায়গায় বাঁধ দিয়ে অনেকে মাছ চাষ করায়- এই এলাকা থেকে পানি সরে না।
চাঁনপুরেরই কিশোর শিক্ষার্থী আবিদ হাসান জানায়, স্কুলে যেতে হলে জুতা হাতে নিয়ে রিকশা ধরতে হয়। পানি ও কাদা ভেদ করে যেতে হয় মূল সড়কে। পায়ে ঘা হয়ে গেছে। এলাকার দোকানপাটও খোলে না পানির জন্য। বাসার জিনিস আনতে অনেক দূরে যেতে হয়।
এ বিষয়ে দেলোয়ার হোসেন বলেন, মানুষজন এ এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন এই ময়লা পানি ঠেলে আসা যাওয়া- কিভাবে সম্ভব! বাসা থেকে বের হয়ে মসজিদে যেতে হয় ময়লা পানি ঠেলে, স্কুলের জুতা হাতে নিয়ে বাচ্চারা বাসা থেকে বের হয়। কতজন আসলো নিউজ করল, কিন্তু উপজেলা বা জেলা প্রশাসনের কি নজরে পড়ল না!
তিনি আরো বলেন, আমরা ছোটবেলায় দেখেছি, মধ্যমপাড়া মসজিদ থেকে একটু দক্ষিণে নালার মত ছিলো। পানি যেন পুরাতন গোমতীতে পৌঁছায় তার জন্য ড্রেন ছিল। সব ভরাট হয়ে গেছে। কিছু অসচেতন মানুষের জন্য পুরো এলাকার মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। প্রশাসনের কাছে জানাতে জানাতে আমরা হয়রান হয়ে গেছি, এখন জানানোই ছেড়ে দিয়েছি।
এ বিষয়ে পাঁচথুবী ইউপি চেয়ারম্যান কাজী তানভীর আহমেদ রাহুল বলেন, দীর্ঘদিনের এ সমস্যা নিরসনে কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েও প্রভাবশালী একটি চক্রের কারণে তা সম্ভব হয়নি। এলাকাটির দুই পাশে পানি অপসারণের রাস্তা বন্ধ হয়ে থাকায় এই সমস্যা। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমাদের এখন নির্দেশনা দিয়েছেন, আমরা সে মোতাবেক দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, মানুষের ভোগান্তি আমাদের সব সময় কষ্ট দেয়। কিন্তু কিছু কিছু সময় আমরা সঠিক নির্দেশনা পাই না এবং সুদৃষ্টি পাই না বিধায় এসব সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়। চাঁনপুর এলাকার অন্তত ৩০ হাজার মানুষ এই জলাবদ্ধতার ভুক্তভোগী।
এ বিষয়ে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা তুজ জোহরা বলেন, আমরা উপজেলার যেসব এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় সেসব এলাকাগুলোর তালিকা করছি- সে জায়গাগুলোতে কী কী ব্যবস্থা নিতে হবে তার জন্য উপজেলা প্রকৌশলীকে পরিদর্শন করে জানানোর জন্য বলা হয়েছে।
কপিল শর্মার ক্যাফেতে আবার হামলা
চাঁদাবাজি নয় হামলার ভিডিওধারণ করায় খুন হন সাংবাদিক তুহিন
চট্টগ্রামে ধসে পড়া সেতু পরিদর্শনে শিল্প উপদেষ্টা