প্রস্তুতি শেষ হয়নি, এখনো নির্মাণ কাজের ত্রিশ শতাংশ বাকি; টার্মিনাল ভবনের ছাদে দেওয়া হয়নি ব্রকশিট। প্রায়ই রানওয়েতে ঢুকে পড়ে কুকুর-গরু। সীমানা নিয়ে ‘বিরোধ’ চলমান। ঝিনুক মার্কেট সরানোর আলোচনা এখন পর্যন্ত নিষ্ফল। কবে মার্কেট সরবে নির্দিষ্টভাবে বলতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বলতে যা বোঝায় তা এখনো বোঝা যাচ্ছে না, ঘাটতি অনেক। তবু বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ আগামী ২ অক্টোবর কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
দেশি-বিদেশি এয়ারলাইনস কোম্পানিগুলোকে ইতিমধ্যে ফ্লাইট চলাচল চালুর জন্য চিঠি দিয়েছে
কর্তৃপক্ষ। ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনকেও (আইকাও) চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানানো হয়েছে। দুই মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। বিমানবন্দরের নাম এখনো চূড়ান্ত না হলেও আপাতত বর্তমান নাম ব্যবহার করে চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বেবিচক সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের নিয়ম অনুযায়ী কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে ঘোষণা করতে আইকাওর কিছু গাইডলাইন মানতে হয়। বাংলাদেশ সরকার সেই গাইডলাইন মেনেই কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘোষণা করেছে। এ বিষয়ক স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য গত ৭ আগস্ট আইকাও কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে বেবিচক।
প্রসঙ্গত, ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল মেয়াদ ধরে কক্সবাজার বিমানবন্দরের উন্নয়ন কাজ শুরু হয়। ২০১৫ সালে যুক্ত হয় আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার নতুন ধাপ। দক্ষিণ এশিয়ায় কক্সবাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। সাগরপাড়ের এই বিমানবন্দরকে পর্যটক ছাড়াও যেকোনো ফ্লাইটের রি-ফুয়েলিংয়ের জন্য টেকনিক্যাল ল্যান্ডিংয়ের আঞ্চলিক কেন্দ্র (হাব) হিসেবে গড়ে তুলতে চাচ্ছে সরকার। বিমানবন্দরের বর্তমান ৯ হাজার ফুট দীর্ঘ রানওয়েকে মহেশখালী চ্যানেলের দিকে আরও ১ হাজার ৭০০ ফুট সম্প্রসারিত করে ১০ হাজার ৭০০ ফুটে উন্নীত করা হয়। ১৭শ ফুট রানওয়ের ১৩শ ফুটই থাকবে সাগরে। দেশে এই প্রথমবারের মতো সমুদ্রের ভেতরে ব্লক তৈরি করে রানওয়ে সম্প্রসারিত হচ্ছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের পর কক্সবাজার হবে ৪র্থ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
দফায় দফায় ঊর্ধ্বতনদের বৈঠক : সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, কক্সবাজার বিমানবন্দরটিকে আন্তর্জাতিক করতে বেবিচক কর্মকর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও বেবিচক চেয়ারম্যান আলাদাভাবে বৈঠক করেছেন একাধিকবার। সর্বশেষ গতকাল বুধবার মন্ত্রণালয়ে কক্সবাজার বিমানবন্দরের পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত থাকা বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চাচ্ছিলাম ডিসেম্বর বা নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু করতে। কিন্তু আমাদেরই কেউ আগেই ফ্লাইট চালু করার তোড়জোড় শুরু করেছেন। তারা সরকারকে বুঝাচ্ছে দ্রুত উদ্বোধন করতে পারলে সুনাম বেশি হবে। কিন্তু এখনো যে পরিমাণ কাজ বাকি, তাতে এটিকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বলা দুষ্কর। জাতীয় নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি থার্ড টার্মিনালের উদ্বোধন করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ নিয়ে দেশ-বিদেশে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে।’
তিনি জানান, ‘আগামী সপ্তাহে (রবিবার বা সোমবার) উপদেষ্টা ও বেবিচক চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতনরা বিমানবন্দরের সর্বশেষ পরিস্থিতি দেখতে কক্সবাজার যাবেন। ২ অক্টোবর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটের মাধ্যমে উদ্বোধন করবেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। প্রায় সব এয়ারলাইনসকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচলের বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশ : বেবিচক সূত্র জানায়, বিমানবন্দরটির টার্মিনাল ভবনের সব কাজ এখনো শেষ হয়নি। ছাদে দেওয়া হয়নি ব্রকশিট। প্যাসেঞ্জার অ্যারাইভাল ও ডিপারচার লাউঞ্জ, ডিপারচার কনভেয়ার বেল্ট এবং ইমিগ্রেশন কাউন্টারের কাজ শেষ হয়নি। যদিও রানওয়ে প্রস্তুত আছে। এসব কাজ করতে দুই মাসের বেশি লাগার কথা নয়। কিন্তু যে গতিতে কাজ চলছে, তাতে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা কঠিন। কাজ শেষ হলেই আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের চলাচল শুরু করা যাবে। বাকি কাজ আগামী ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ করতে বলেছে বেবিচক।
এয়ারলাইনসগুলোকে চিঠি : গত ১১ আগস্ট বেবিচকের বোর্ড সদস্য (এটিএম) গ্রুপ ক্যাপ্টেন মো. নুর-ই-আলম স্বাক্ষরিত চিঠিতে দেশের দুই শীর্ষস্থানীয় এয়ারলাইনস বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসকে চিঠি দিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে তারা কোন ধরনের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা করছে এবং কোন গন্তব্যে চালু করবে। তা লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে। বিদেশি এরলাইনসগুলোকেও একই চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ এখনো চিঠির জবাব দেয়নি বেবিচককে।
নানা সমস্যা বিমানবন্দরে : বেবিচক কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানায়, লম্বা সময় ধরে কাজ হলেও পদে পদে বাধা আসছে, সে বাধা ডিঙ্গাতে পারছে না প্রকল্পের লোকজন। বিমানবন্দরের বড় বাধা ৩ হাজার ৩০০ পরিবার। তাদের উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না। এখনো ৪ দশমিক ৬৪ একর জমি অধিগ্রহণ করা যায়নি। কক্সবাজার বিমানবন্দর দিয়ে গড়ে ২৫-৩০টি যাত্রীবাহী ও ৬-১০টি কার্গো বিমান উড্ডয়ন-অবতরণ করছে। যাত্রীদের চাপ বেড়ে যাওয়ায় সামলানোর নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দরের অনুকূলে বন্দোবস্তকৃত ভূমি থেকে পুরনো ঝিনুক মার্কেটের ১৪টি দোকান ও বস্তিসহ ৪২টি পরিবারকে সরানো যাচ্ছে না। ঝিনুক মার্কেট এলাকায় অবশিষ্ট ০.০৪ একর জমি অধিগ্রহণ করা যাচ্ছে না। বিমানবন্দরের ৪.৫৬ একর জমিতে স্থিত গণপূর্ত, সড়ক ও জনপথ বিভাগের স্থাপনা অপসৃত না হওয়ায় অধিগ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। বিমানবন্দরের অপারেশনাল এলাকার অভ্যন্তরে সেনাবাহিনীর দাবিকৃত ৬.৫৭ একর জমির মধ্যে ৪.৬৪ একর জমিতে প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নে বাধা দেওয়ায় ফায়ার স্টেশন ভবন, ড্রেনেজ, পেরিফেরিয়াল রোড ও সিকিউরিটি বাউন্ডারি ওয়াল করা সম্ভব হচ্ছে না। বিমানবন্দরের অনুকূলে ৬৮২ একর জমির মধ্যে ৯৭ একর জমিতে ৩৩শ পরিবারকে উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি।
কী কী কাজ হয়েছে : সমুদ্রগর্ভে রানওয়ের কাজ ৯৭ ভাগ শেষ হয়েছে। বাঁধের কাজ শেষ হয়েছে ৯৫ ভাগ। সমুদ্রগর্ভে ২ হাজার ২০০ ফুট দৈর্ঘ্যরে প্রিসিশন অ্যাপ্রোচ লাইট স্থাপনসহ মেইনটেন্যান্স স্টিল ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে ৮৫ ভাগ। রানওয়ের চারপাশে নিরাপত্তা সীমানাপ্রাচীর ও নিরাপত্তা টহল সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে ৩২ ভাগ। রানওয়ের চারপাশে ড্রেনেজ সিস্টেম নির্মাণ করা হয়েছে ৬২ ভাগ।
রানওয়েতে কুকুর ও গরুর বিচরণ : জানা গেছে, গত ৩ আগস্ট সন্ধ্যায় ৭২ যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়েতে ছুটে চলছিল এয়ার এস্ট্রার একটি উড়োজাহাজ। উড্ডয়নের আগমুহূর্তে ঘটে যায় অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা। চলন্ত উড়োজাহাজের সঙ্গে রানওয়েতে চলে আসা একটি কুকুরের ধাক্কা লাগলে জরুরি ব্রেক কষতে হয় পাইলটকে। উড়োজাহাজের চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে কুকুরটি মারা গেলেও বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পান যাত্রীরা। জরুরি ব্রেকে সৃষ্ট ঝাঁকুনিতে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এক ঘণ্টা পর ফ্লাইটটি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়। এর আগেও বিমানবন্দরের রানওয়েতে পশু-পাখির সঙ্গে ফ্লাইটের ধাক্কা লাগার ঘটনা ঘটেছে। কক্সবাজার বিমানবন্দরে পশু-পাখি তাড়ানোর জন্য যন্ত্রপাতি ও বার্ড শুটার না থাকায় ঝুঁকিতে রয়েছে বিমান চলাচল। ২০২১ সালে উড্ডয়ন করতে গিয়ে রানওয়েত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজের ধাক্কায় দুটি গরু মারা যায়।
বেবিচকের সদস্য (অপারেশন অ্যান্ড প্ল্যানিং) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মাহবুব খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তরে জোরেশোরে কাজ চলছে। বাকি কাজ নির্দিষ্ট সময়ে শেষ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট শুরুর আগে আইকাও কর্তৃপক্ষকে জানাতে হয়। তাদের আমরা চিঠি দিয়েছি।’
