বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। বার্ষিক এই প্রতিবেদনে দেশের ‘পরিস্থিতি এখন স্থিতিশীল’ থাকলেও ‘কিছু বিষয় নিয়ে উদ্বেগ’ রয়ে গেছে বলে জানানো হয়েছে। যদিও ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মানবাধিকারের ক্ষেত্রে কোনো কোনো বিষয় নিয়ে উদ্বেগ এখনো রয়ে গেছে তা উল্লেখ করা হয়নি।
প্রতিবেদনটি করা হয়েছে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সংঘটিত ঘটনার বিষয়ে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে। ওই বছরের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। আন্দোলনে ওই সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট ক্ষমতায় আসে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
এদিকে, বাংলাদেশে মানবাধিকার নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের অনেকে বলছেন, আওয়ামী লীগের সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে। আর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘মব’ সন্ত্রাস, গায়েবি মামলা ও সংখ্যালঘু নিপীড়ন।
মানবাধিকার ইস্যুতে বাংলাদেশকে সহায়তার জন্য ঢাকায় মানবাধিকার মিশন চালু করতে জাতিসংঘ ও সরকারের মধ্যে সম্প্রতি সমঝোতা হয়েছে। যদিও ধর্মভিত্তিক কিছু দল এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। সরকার অবশ্য বলেছে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার-সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা পালনে বাংলাদেশকে সহায়তা করাই তাদের এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
যুক্তরাষ্ট্রের রিপোর্টে কী কী বিষয় আছে
গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ‘২০২৪ কান্ট্রি রিপোর্টস অন হিউম্যান রাইটস প্র্যাক্টিসেস : বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়েছে, আগস্টের কিছু ঘটনার পর বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হলেও ‘কিছু বিষয়ে এখনো উদ্বেগ রয়ে গেছে।’
বিবিসি বলছে, রিপোর্টে মূলত গত বছরে আওয়ামী লীগ সরকার যতটা সময় ক্ষমতায় ছিল সে সময়কার ঘটনা আর জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময়কার মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, গত সরকারের আমলে মানবাধিকার ইস্যুতে উল্লেখযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য তথ্য আছে যেসব বিষয়ে, তার মধ্যে আছে বেআইনি হত্যা, গুম, নির্যাতন ও নিষ্ঠুরতা, অমানবিক শাস্তি, নির্বিচারে আটক ও গ্রেপ্তার, প্রবাসে থাকা সমালোচকদের হয়রানি, মতপ্রকাশ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর গুরুতর বিধিনিষেধ, যার মধ্যে আছে সাংবাদিকদের সহিংসতার হুমকি, অযৌক্তিক গ্রেপ্তার ও বিচার এবং সেন্সরশিপ, শ্রমিকদের সংগঠন করার ওপর বিধিনিষেধ এবং শিশুশ্রমের মতো বিষয়গুলো।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘গত সরকারের সময়ে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িতদের ব্যাপকভাবে দায়মুক্তির তথ্য পাওয়া গেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর বা সরকারি কর্মকর্তা যারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজির খুবই কম ছিল।
অবশ্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে গত সরকারের যারা জড়িত ছিলেন, অভিযোগ রয়েছে তাদের অনেককে আটক করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই ও আগস্টে তখনকার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদনে এগুলো এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে জাতিসংঘের সঙ্গে কাজ করছে। অপরাধীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রচলিত বিচারব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালউভয়কেই কাজে লাগানো হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের সরকার কখনো নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা মোট কতজন নিহত হয়েছে তার কোনো সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি। তারা ঘটনাগুলোর স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্তের কোনো উদ্যোগও নেয়নি। কিছু ক্ষেত্রে তখন শুধু প্রশাসনিক শাস্তি হয়েছে।
স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটিকে উদ্ধৃত করে ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত বছর ১৬ জুলাই থেকে ৯ সেপ্টেম্বর সময়ের মধ্যে কমপক্ষে ৯৮৬ জন নিহত হয়েছেন।
তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন গত বছর ২০ সেপ্টেম্বর জানিয়েছিল যে সহিংসতায় ১৪২৩ জন মারা গেছে এবং ২২ হাজার আহত হয়েছে। এর মধ্যে ৭৭ শতাংশই বুলেটবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে। নিহতদের ৭০ শতাংশই ৩০ বছরের কম বয়সি এবং ৫২ শতাংশই ছিল ছাত্র। নিহতদের মধ্যে ১০৭টি শিশু, ৬ সাংবাদিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর ৫১ জন সদস্য ছিলেন।
সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের বিষয়ে রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত বছর অক্টোবর ও নভেম্বরে গত সরকার বা তখনকার সরকারি দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল এমন ১৬৭ জন সাংবাদিকের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ ও সেনাসদস্যরা নির্যাতনসহ বিভিন্ন নিষ্ঠুরতার তথ্য মানবাধিকার সংস্থাগুলো ও সংবাদমাধ্যমের খবরে এসেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্য ও জঙ্গিদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য নিরাপত্তা বাহিনী নির্যাতন করেছে বলে তথ্য রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর।
প্রতিবেদনে গত সরকারের সময়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে বা বিজ্ঞাপন না দেওয়ার জন্য বিভিন্ন কোম্পানির ওপর চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে থাকা অভিযোগের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘বিরোধী রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম ও বিবৃতি প্রচার কিংবা সমালোচনামূলক রিপোর্ট প্রকাশের কারণে সংবাদমাধ্যমকে শাস্তির মুখে পড়তে হতো। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এসব পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।’
এ ছাড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটিতে অল্প কিছু ইহুদি পরিবার ছিল। রাজনীতিক ও ইমামরা অ্যান্টিসিমেটিক (ইহুদিবিদ্বেষ) বিবৃতি দিয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছিল, ক্ষমতায় বসার এক বছরেও মানবাধিকার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার। তাদের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, ‘এই সরকারের সময়ও অতীতের মতো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনে নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও অন্যায়ভাবে আটক করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের অধিকার সুরক্ষার বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না।’ তখন সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিল।
আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল তখন বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, আইন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
গ্রেপ্তার ও বিচার প্রক্রিয়ায় কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়, সেজন্য আইনগত সংস্কারের প্রক্রিয়াও চলছে।
