সিলেটের সীমান্তবর্তী কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার নয়নাভিরাম পর্যটনকেন্দ্র সাদা পাথর থেকে পাথর লুটে কারা জড়িত তা বের করতে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল বুধবার দুদক সিলেট কার্যালয়ের কর্মকর্তারা সরেজমিনে সাদা পাথর পর্যট কেন্দ্রে গিয়ে এ ব্যাপারে অনুসন্ধান চালিয়েছেন। তারা ওই এলাকার ভিডিওচিত্র ধারণ এবং স্থানীয়দের বক্তব্য রেকর্ড করেছেন।
গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে দুদক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অপরূপ সৌন্দর্য্যে ভরপুর একটি পর্যটনকেন্দ্র থেকে এভাবে পাথর লুটের ঘটনার দায় স্থানীয় প্রশাসন এড়াতে পারে না। পাথর লুটে স্থানীয় প্রভাবশালী, ব্যবসায়ীসহ অনেকে জড়িত থাকতে পারেন। সাদা পাথরের এই সরকারি সম্পদ কারা আত্মসাৎ করল তাদের চিহ্নিত করে দুদক আইনানুগ পদক্ষেপ নেবে। এদিকে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে সাদা পাথর লুটপাটের সঙ্গে জড়িত কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাহাব উদ্দিনসহ অন্যদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করতে দুদকে লিখিত আবেদন করেছেন অ্যাডভোকেট সালাহ উদ্দিন রিগ্যান। গতকাল তিনি দুদকের প্রধান কার্যালয়ে এ আবেদন করেন।
দুদক চেয়ারম্যান বরাবর দাখিল করা আবেদনে বলা হয়েছে, ‘আমি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। একজন সচেতন নাগরিক এবং মানবাধিকারকর্মী ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। গত ১২ আগস্ট দেশ রূপান্তরসহ কয়েকটি গণমাধ্যমে “লুটে শেষ সাদা পাথর ও প্রকাশ্যে লুট হয়ে যাচ্ছে সাদা পাথর পর্যটন স্পট ধ্বংসের পথে” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এভাবে পর্যটনকেন্দ্রের সাদা পাথর লুট করে দেশের পর্যটনশিল্পে ধস নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাদা পাথর লুটের কারণে রাষ্ট্রের হাজার-হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ বিষয়টি যথাযথ অনুসন্ধান করতে বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হলো।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাডভোকেট সালাহ উদ্দিন রিগ্যান বলেন, সিলেটে কোটি কোটি টাকার সাদা পাথর লুটপাট করা হয়েছে। লুটপাটের ঘটনা নিয়ে কয়েকটি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। আমি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদগুলো যুক্ত করে দুদকের অনুসন্ধান শুরুর জন্য আবেদন করেছি। আশা করি, দুদক এ বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করবে।
অন্যদিকে সাদা পাথর লুটপাটের ঘটনার প্রেক্ষিতে গতকাল বিশেষ পর্যালোচনা সভা করেছেন জেলা প্রশাসক। কিভাবে সাদা পাথর লুট হলো তা খতিয়ে দেখা এবং সাদা পাথরকে লুটপাটকারীদের হাত থেকে কিভাবে রক্ষা করা যায় এ বিষয়ে সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসন ৩ সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করেছে।
সাদা পাথর লুটপাটের ঘটনা নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে দেশে তোলপাড় চলছে। মনোরম একটি পর্যটনকেন্দ্রকে এভাবে ধ্বংসের নিন্দা ও ক্ষোভ জানাচ্ছে বিভিন্ন মহল। এর প্রেক্ষিতে প্রশাসন যেন কিছুটা নড়েচড়ে বসেছে। গতকাল দুপুরে দুদক সিলেট কার্যালয়ের একটি দল সরেজমিনে ঘটনাস্থলে যায়। পরিদর্শন শেষে দুদকের উপপরিচালক রাফি মো. নাজমুস সাদাত সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘এই লুটের ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের দায় রয়েছে। এটা রক্ষা করা তাদের দায়িত্ব ছিল। প্রশাসনের আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন ছিল। এ ছাড়া খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোসহ যেসব বিভাগ এর সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদেরও ভূমিকা রাখা প্রয়োজন ছিল।’
তিনি বলেন, ‘এখানে কয়েকশ কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করা হয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য নষ্ট করা হয়েছে। পর্যটকরা আফসোস করছেন।’
কারা এই লুটের সঙ্গে জড়িত এমন প্রশ্নে দুদক কর্মকর্তা বলেন, ‘আশপাশে অনেক স্টোন ক্রাশার মিল রয়েছে। এরা পাথর ভেঙে বিক্রি করে। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, উচ্চস্তরের ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালীরা জড়িত বলে শুনতে পাচ্ছি। আমরা এসব তথ্য নিয়ে বিস্তারিত কাজ করব। এই লুটের সঙ্গে কারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করতে কাজ করছি। এ ব্যাপারে প্রাথমিক অনুসন্ধান প্রতিবেদন দুদক প্রধান কার্যালয়ে প্রেরণ করা হবে। পরবর্তীত তাদের নির্দেশনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি : সাদা পাথর লুটপাটের ঘটনায় সিলেট জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে প্রধান করে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। বুধবার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এ ব্যাপারে আমরা একটি পর্যালোচনা সভাও করেছি। তিনি বলেন, ‘লুটপাটের ঘটনা দুঃখজনক। সাদা পাথরে কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে তা তদন্তের জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
উল্লেখ্য, গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে সিলেটের সাদা পাথর, জাফলংসহ বিভিন্ন কোয়ারি থেকে পাথর লুটপাট শুরু হয়। কিছুদিন আগে জাফলং পরিদর্শনে গিয়ে পাথর ব্যবসাসংশ্লিষ্টদের ঘেরাওয়ের মুখে পড়েছিলেন পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানও। ওইদিন তিনি সাদা পাথর যাওয়ার কর্মসূচি পর্যন্ত বাতিল করেন। ওইদিন সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পরিবেশ উপদেষ্টা বলেছিলেন, ‘পাথর তোলার ক্ষেত্রে আমি সর্বদলীয় ঐক্য দেখছি। তারা সবাই মিলে পাথর তুলতে চায়। আমি উপদেষ্টা হয়েও জাফলংয়ের পরিবেশ রক্ষা করতে পারছি না।’
অবৈধভাবে পাথর লুটের ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি সাদা পাথর থেকে ব্যাপক লুটপাট হয়। এতে সাদা পাথর অনেক বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছে। এই লুটে কতিপয় রাজনৈতিক নেতা, স্থানীয় প্রশাসন, পাথর ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। দুইদিন আগে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাহাব উদ্দিনের পদ স্থগিত করেছে কেন্দ্রীয় বিএনপি। তবে লুটপাটে আরও অনেক নেতার নাম আলোচিত হচ্ছে।
