পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়াতে দেড় দশক ধরে অকার্যকর থাকা বাংলাদেশ-পাকিস্তান জয়েন্ট ইকোনমিক কমিশন কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। একই সঙ্গে নতুন করে ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কমিশন গঠনের আলোচনা করছি। তিনি বলেন, দুদেশের বাণিজ্য সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটিয়ে বাণিজ্য সহজ করার জন্য যাবতীয় বিষয় নিয়ে পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে সফররত পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খানের সঙ্গে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পূর্ব নির্ধারিত সভা করেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এ সভা শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন বাণিজ্য উপদেষ্টা ও বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। এই সভার আগে পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এবং ঢাকা চেম্বারের সভাপতির সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে খুবই নিবিড় আলোচনা হয়েছে। দুই দেশ যৌথভাবে বা বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে ইন্টারমিডিয়েট পণ্য উৎপাদন করতে পারলে তা উভয় দেশের জন্য লাভজনক হবে। আমাদের হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের ওপর পাকিস্তান অ্যান্টিডাম্পিং ডিউটি আরোপ করে রেখেছে পাকিস্তান। আমরা সেটা প্রত্যাহার করতে অনুরোধ করেছি। তারা আশ্বাস দিয়েছে। এ ছাড়া আমাদের চামড়া ও চিনি শিল্প উন্নয়নে সহায়তা চেয়েছি। কারণ চিনি শিল্পে তাদের উন্নত প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা রয়েছে।
শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, এক সময় পাকিস্তান আমাদের এক কোটি কেজি চা রপ্তানিতে ডিউটি ফ্রি সুবিধা দিত, তা আবার বহাল করতে অনুরোধ করেছি। আমরা কৃষি ও খাদ্যপণ্য, ফল আমদানি ও রপ্তানি নিয়ে আলোচনা করেছি। স্থানীয়ভাবে চিনি উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়াতে পাকিস্তানের সহায়তা চেয়েছি। মধ্যবর্তী পণ্য উৎপাদনে পাকিস্তানের বিনিয়োগ চেয়েছি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রতি বছর ৮০ বিলিয়ন ডলার আমদানি করে, যার মধ্যে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ফুড অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়েট পণ্য। দুই দেশের মধ্যে এসব পণ্য বাণিজ্য বাড়ানোর সুযোগ আছে, সেটা খতিয়ে দেখার জন্য নতুন ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কমিশন গঠন করা হচ্ছে।
তিনি জানান, তারা আমাদের সব প্রস্তাব ইতিবাচকভাবে দেখেছে। আমাদের কৃষির যন্ত্রিকীকরণ এবং কৃষির সোর্সিং থেকে শুরু করে আমাদের যেসব মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি করে থাকি সেগুলোতে সক্ষমতা তৈরির ক্ষেত্রে বিনিয়োগের কথা বলেছি। তারা সব বিষয়ে আমাদের বিষয়গুলোর সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন এবং কমিশনে প্রাসঙ্গিকভাবে বিষয়গুলো উত্থাপন করে এর প্রয়োগ কৌশল নির্ধারণে একমত হয়েছেন।
বাংলাদেশ পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছে কি না, এমন প্রশ্নে উপদেষ্টা বলেন, আমরা সবার দিকে ঝুঁকছি। পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকছি। ভারত থেকেও পেঁয়াজ আনছি। সর্বাগ্রে বাংলাদেশের স্বার্থ, যেখানে দেশের স্বার্থ আছে, সেখানেই ঝুঁকছি।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবর রহমান বলেন, গত দেড় দশক পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য তেমন ছিল না বললেই চলে। খাদ্য ও পাথরসহ বিভিন্ন পণ্য আমরা নানা দেশ থেকে আমদানি করি, প্রতিযোগিতামূলক দরে পাকিস্তান থেকে এসব পণ্য আনা গেলে সমস্যা নেই। একই সঙ্গে আমাদের রপ্তানি বাড়ানোয় গুরুত্ব দিছি। বর্তমানে পাকিস্তান থেকে আমরা ইম্পোর্ট করি বেশি, রপ্তানি কম করি। আমরা রপ্তানি বাড়াতে পারলে দেশের জন্য লাভজনক হবে।
তিনি বলেন, দুদেশের ব্যবসা বাড়াতে বাণিজ্য সহজীকরণ করার কোনো বাধা দেখি না। আমরা পাথর এবং বিভিন্ন ধরনের খনিজ আমদানি করি বিদেশ থেকে। যদি তাদের উৎস থেকে এসব আমদানি করা যায় এবং এটা যদি প্রতিযোগিতামূলক হয় তাহলে আমরা সেটাকে স্বাগত জানাব। সেই পরিপ্রেক্ষিতে উভয়ের স্বার্থ সংরক্ষণ করে যদি পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানো যায় এবং সুসম্পর্ক বজায় রাখা যায়, তাহলে বাংলাদেশ এটাকে স্বাগত জানায়। এই ধারণাই বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রীকে দিয়েছেন।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তান উভয়েই দুদেশ থেকে কী কী পণ্য আমদানি রপ্তানি করলে লাভবান হবে সে বিষয়গুলোতেই গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হয়েছে বলে জানান বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান।
পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খানের চার দিনের এই সফরের প্রথম দিনে আলোচনা করেছেন খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদারের সঙ্গে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ে এই সাক্ষাৎ হয়। এ সময় খাদ্য উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পাকিস্তানের করাচি বন্দর থেকে সরাসরি পণ্যবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আসছে। এর মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্য কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে। পূর্বে পাকিস্তানি পণ্য তৃতীয় দেশের মাধ্যমে বাংলাদেশে আমদানি হতো। এতে সময় এবং খরচ বৃদ্ধি পেত। পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী দুদেশের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী সকালে প্রথম বৈঠক করেন শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের সঙ্গে। মতিঝিলে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎকালেও শিল্প উন্নয়নের ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে শিল্প উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। তিনি এই সময় বাংলাদেশে চিনিশিল্প, চামড়াশিল্প, সিমেন্ট, জাহাজ নির্মাণ ও কৃষির উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
এ সময় বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) ও পাকিস্তানের হালাল অথরিটির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের বিষয়ে আলোচনা হয়। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের চিনিশিল্পের উন্নয়নে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা বৈঠকে জানানো হয়।
এরপর পাক বাণিজ্যমন্ত্রী ঢাকা চেম্বারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও একটি বৈঠক করেছেন। এতে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, পাকিস্তানের টেক্সটাইল ও বিশেষ করে জুয়েলারি পণ্য এ দেশের মানুষের মধ্যে বেশ চাহিদা রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ উন্নয়নে এফটিএ স্বাক্ষরের জন্য এ দেশের বেসরকারি খাত সবসময়ই সরকারকে প্রস্তাব দিয়ে আসছে এবং পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের এফটিএ স্বাক্ষর হলে দ্বিপক্ষীয় ব্যবসা-বাণিজ্য আরও সম্প্রসারিত হবে। তিনি বলেন, দুদেশের মধ্যে সরাসরি বিমান ও কার্গো যোগাযোগ চালু হতে ব্যবসায়িক যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে।
পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খান বলেন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান উভয়ই রপ্তানির ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক এবং টেক্সটাইল খাতের ওপর অধিকমাত্রায় নির্ভরশীল, দুদেশেরই রপ্তানি পণ্যের বহুমূখীকরণের ওপর জোরারোপ করা প্রয়োজন।
আজ পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রীর চট্টগ্রামের একটি ইস্পাত কারখানা পরিদর্শনের কথা রয়েছে। সেখানে ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও তিনি একটি বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে। এই সফরে চারটি এমওইউ স্বাক্ষরের কথা রয়েছে।
