শ্রীলঙ্কার অভ্যুত্থান পরবর্তী প্রেসিডেন্ট রনিল গ্রেপ্তার

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৫, ০৬:৪৮ এএম

রাষ্ট্রীয় তহবিল অপব্যবহারের অভিযোগে শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহেকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির পুলিশ। ২০২২ সালে দেশটিতে হওয়া গণঅভ্যুত্থানের পর প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি। বিবিসি বলছে, ওই দফায় প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিক্রমাসিংহের ‘অতিরিক্ত’ বিদেশ সফরের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

বিবিসি সিংহলের প্রতিবেদন অনুসারে, ৭৬ বছর বয়সী এই নেতা তার প্রেসিডেন্ট পদে থাকাকালে ২৩ বার বিদেশ সফর করেছেন, যার জন্য রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন শ্রীলঙ্কান রুপি (প্রায় ২০ লাখ মার্কিন ডলার) ব্যয় হয়েছে।

স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল আদা ডেরানার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গতকাল শুক্রবার দেশটির রাজধানী কলম্বোর একটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিক্রমাসিংহেকে হাজির করার কথা ছিল। তার আগে তিনি শ্রীলঙ্কা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কাছে জবানবন্দি দেন। জবানবন্দি দেওয়ার পরপরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বিবিসি জানাচ্ছে, অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যে বিক্রমাসিংহের একটি সংক্ষিপ্ত সফর। সিআইডির দাবি, ওই সফরে বিক্রমাসিংহে তার স্ত্রী মৈত্রী বিক্রমাসিংহের সঙ্গে ওলভারহ্যাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সমাবর্তন অনুষ্ঠানে অংশ নেন, যা একটি ব্যক্তিগত সফর ছিল। এই সফরের খরচ রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে বহন করা হয়।

তবে বিক্রমাসিংহে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, সফরটি আনুষ্ঠানিক ছিল এবং এর খরচ বৈধভাবে ব্যয় করা হয়েছে।

এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কিউবায় জি ৭৭ সম্মেলনে যোগদানের পর দেশে ফেরার পথে বিক্রমাসিংহে যুক্তরাজ্যে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি করেন। এ সময় তিনি ওলভারহ্যাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে অংশ নেন, যেখানে তার স্ত্রী মৈত্রী বিক্রমাসিংহে একটি সম্মানসূচক ডিগ্রি গ্রহণ করেন। সিআইডির তদন্তে দাবি করা হয়েছে, এই সফরের জন্য ব্যয়িত অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ২০ মিলিয়ন শ্রীলঙ্কান রুপি (প্রায় ৬৭,০০০ মার্কিন ডলার), যা রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে নেওয়া হয়েছিল।

রনিল বিক্রমাসিংহে ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে জনরোষের মুখে দেশত্যাগ করলে তিনি ক্ষমতায় আসেন। তার নেতৃত্বে শ্রীলঙ্কা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সহায়তায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে ফিরে আসে, যার জন্য তিনি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হন। তবে দেশের অভ্যন্তরে তার কঠোর অর্থনৈতিক সংস্কার নীতি, যেমন কর বৃদ্ধি ও জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি, জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। বিক্রমাসিংহে ১৯৯০-এর দশক থেকে শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে একটি প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তিনি ছয় দফায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির (ইউএনপি) নেতা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন।

শ্রীলঙ্কা পুলিশের মুখপাত্র গ্রেপ্তারের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি। বিক্রমাসিংহের দপ্তরও রয়টার্সের অনুরোধে কোনো বিবৃতি দেয়নি। তবে স্থানীয় গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, এই গ্রেপ্তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে, কারণ বিক্রমাসিংহের নেতৃত্বাধীন ইউএনপি এবং বর্তমান সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।

বিবিসি বলছে, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিক্রমাসিংহে পরাজিত হন। তাকে হারিয়ে প্রেসিডেন্ট হন ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার (এনপিপি) নেতা অনুরা কুমার দিসানায়েক। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে পূর্ববর্তী প্রশাসনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত জোরদার করেছে।

স্থানীয় গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্রমাসিংহের গ্রেপ্তার নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তার সমর্থকরা দাবি করছেন, এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ। তবে তার বিরোধীরা বলছেন, এটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের প্রতিফলন।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই গ্রেপ্তার শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে, বিশেষ করে দেশটি যখন অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সংগ্রাম করছে।

রনিল বিক্রমাসিংহের গ্রেপ্তার শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এটি কেবল একজন প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নয়, বরং দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। আদালতে এই মামলার শুনানি এবং তদন্তের ফল শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত