হাসিনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য

প্রলোভন দেখানো হয় ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসককে

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৫, ০৭:৩৫ এএম

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন সরকারের ইচ্ছামতো দেওয়ার বিনিময়ে প্রলোভন দেখানো হয় রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. রাজিবুল ইসলামকে। তাকে সিঙ্গাপুর কিংবা থাইল্যান্ড যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। জুলাই-আগস্টে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে গতকাল রবিবার সাক্ষ্যদানকালে জবানবন্দিতে এসব কথা বলেন রমেক হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. রাজিবুল। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ এ সাক্ষ্য গ্রহণ হয়। গতকাল এ মামলায় ডা. রাজিবুলসহ তিনজনের সাক্ষ্য গ্রহণ হয়। অপর দুজন হলেন রমেক হাসপাতালের অফিস সহকারী মো. গিয়াসউদ্দিন ও জুলাই অভ্যুত্থানে কুষ্টিয়ায় গুলিবিদ্ধ স্থানীয় সাংবাদিক শরীফুল ইসলাম। জবানবন্দি শেষে তাদের জেরা করেন আসামি পক্ষের আইনজীবী মো. আমীর হোসেন। প্রসিকিউশন পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর মোহাম্মদ মিজানুল ইসলাম। তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে আজ সোমবার পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করে আদালত। এ নিয়ে মামলার আসামি শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে সাত কার্যদিবসে ১৯ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিলেন।

জবানবন্দিতে ডা. রাজিবুল ইসলাম বলেন, ১৬ জলাই তিনি আবু সাঈদের মরদেহের ময়নাতদন্ত করেন। ময়নাতদন্ত শেষে তিনি প্রতিবেদনে অনেকগুলো পিলেটবিদ্ধ হয়ে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণে আবু সাঈদের মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি মতামত দিই, এই মৃত্যু হোমিসাইডাল ইন নেচার। এই ঘটনায় রংপুরের তাজহাট থানার মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে এই রিপোর্ট জমা দিতে গেলে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর আমার রিপোর্ট গ্রহণ  না করে পুনরায় রিপোর্ট তৈরি করতে বলেন।’ এরপর দ্বিতীয়বার ও তৃতীয়বারও তার রিপোর্ট গ্রহণ করা হয়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি। জবানবন্দিতে এই চিকিৎসক বলেন, তাকে রমেকের উপাধ্যক্ষের কক্ষে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে  প্রিন্সিপাল ডা. মাহফুজুর রহমান, সিটি এসবি এসপি সিদ্দিক, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি মারুফ এবং স্বাচিপের রংপুর মেডিকেল কলেজ শাখার সভাপতি ডা. চন্দন তাদের কথামতো ময়নাতদন্ত রিপোর্ট তৈরি করতে তাকে চাপ ও ভয়ভীতি দেখান। তারা বারবার বলছিলেন যেন মাথায় আঘাতের কারণে আবু সাঈদের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়।

তখন ডিজিএফআই, এনএসআই ও পুলিশের অন্যান্য কর্মকর্তা বাইরে অবস্থান করছিলেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি। ডা. রাজিবুল বলেন, ‘তারা প্রলোভন দেখিয়ে বলেন যে, আপনি সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড ঘুরে আসেন। আমি বলি যে, ‘আমার পাসপোর্ট নেই’। তখন তারা বলেন, ‘তাহলে দুই সপ্তাহের ছুটি নিয়ে কক্সবাজার যান।’ ডা. রাজিবুল বলেন, ‘আমি ভাইস প্রিন্সিপালকে বলি, আবু সাঈদের মৃত্যু যে গুলিতে হয়েছে তা পৃথিবীর সব মানুষ দেখেছে, মিডিয়াতে প্রচার হয়েছে। আমি যদি এখন লিখি যে, মাথায় আঘাতের কারণে আবু সাঈদের মৃত্যু হয়েছে, তাহলে সারা বিশ্বের লোক ডাক্তার সমাজকে ঘৃণা করবে। তিনি বলেন, এরপর পঞ্চম প্রতিবেদনটি গ্রহণ করা হয়। তবে, মাঝে একটি প্রতিবেদন পুলিশ ধ্বংস করার চেষ্টা করলেও তিনি তা সরিয়ে রাখায় পুলিশ তা করতে পারেনি। গত ৩ আগস্ট এ মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। গত ১ জুন তিন আসামির বিরুদ্ধে দাখিলকৃত অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। ওই দিন শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করে ১৩টি ভলিউমে সাড়ে আট হাজার পৃষ্ঠার নথি ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়। যাতে ৫টি অভিযোগ আনা হয়। এরপর ১০ জুলাই ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গঠন করলে বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত