সীমান্তে জীবন সংকটাপন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেই শুধু মারণাস্ত্র ব্যবহার করা হয় ভারতীয় বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) মহাপরিচালকের (ডিজি) দালজিৎ সিং চৌধুরীর এমন মন্তব্যে দ্বিমত জানিয়েছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ডিজি মেজর মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৬তম সীমান্ত সম্মেলনের শেষ দিন গতকাল বৃহস্পতিবার পিলখানার বিজিবি সদর দপ্তরের শহীদ ক্যাপ্টেন আশরাফ হলে আয়োজিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের করা এক প্রশ্নের জবাবে এমন পরিস্থিতির অবতারণা হয়।
সীমান্তে হত্যা বন্ধের বিষয়ে বিজিবি ও বিএসএফ কী ধরনের সিদ্ধান্তে উপনীত হলো? এমন প্রশ্নের জবাবে বিএসএফ ডিজি বলেন, ‘চলতি বছর প্রথম ছয় মাসে ৩৫ জন বিএসএফ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন অনুপ্রবেশকারীদের ধারালো অস্ত্রের হামলায়। সীমান্ত এলাকায় বিএসএফ সদস্যরা প্রথমে সতর্ক করে, বাধা দেয়। শেষ পদক্ষেপ হিসেবে গুলি ছোড়া হয়।’ তার এমন মন্তব্যের পরে তাৎক্ষণিক দ্বিমত পোষণ করেন বিজিবি মহাপরিচালক। প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি একজন অল্পবয়সী বাংলাদেশি নাগরিককে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করেছে বিএসএফ। ওই শিশুটি বর্ডার নিরাপত্তার জন্য কতটুকু ঝুঁকিপূর্ণ ছিল?’ যদিও এমন প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গেছেন বিএসএফ ডিজি।
তবে সীমান্ত হত্যা নিয়ে সার্বিকভাবে বিজিবি মহাপরিচালক বলেন, ‘এটা নিয়ে এবার সীমান্ত সম্মেলনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হয়েছে। সীমান্তে মারণাস্ত্র ব্যবহার বন্ধ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় রাতের বেলায় টহল জোরদার করে সীমান্ত হত্যার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে সে ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। উভয়পক্ষ যৌথভাবে সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সামাজিক অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণ, সীমান্তের অলঙ্ঘনীয়তা সম্পর্কে প্রেষণা প্রদান এবং অপরাধীদের আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম প্রতিরোধের মাধ্যমে এ ধরনের আক্রমণ, নির্যাতন ও হামলার ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনার বিষয়ে উভয়পক্ষ সম্মত হয়।’
এবারের সম্মেলনে বিশেষ গুরুত্ব পায় পুশব্যাক ও পুশইনের বিষয়টিও। এ প্রসঙ্গে দালজিৎ সিং চৌধুরী বলেন, ‘যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বাংলাদেশে পুশব্যাক করানো হচ্ছে। শুধু যারা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী তাদেরই বিরুদ্ধে নিয়ম মেনে পুশইন করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৫৫০ জনকে বিজিবির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, এ-সংক্রান্ত ২ হাজার ৪০০ কেস যাচাই প্রক্রিয়া চলছে, বাংলাদেশ হাইকমিশন সহযোগিতা করছে।’
পুশইনের নামে কেন ভারতে আশ্রিত রোহিঙ্গাদেরও বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে বিএসএফ? এ ছাড়া কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভারতীয় নাগরিকদের পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এসব বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বিএসএফ মহাপরিচালক বলেন, ‘আইনের মধ্য থেকে যথাযথ চ্যানেলে পুশইন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে। যদি এমন (ভারতীয় রোহিঙ্গা, নাগরিক) কোনো ঘটনা ঘটে থাকে, যথাযথ প্রক্রিয়ায় জানানো হলে ভারত তাদের সহযোগিতা করবে।’
বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে চার দিনব্যাপী (২৫-২৮ আগস্ট) মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৬তম সীমান্ত সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক বৈঠক গতকাল শেষ হয়েছে। সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ২১ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছাড়াও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, সড়ক বিভাগ, ভূমি জরিপ অধিদপ্তর, যৌথ নদী কমিশন এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রতিনিধিত্ব করছেন। অন্যদিকে, বিএসএফ মহাপরিচালক দালজিৎ সিং চৌধুরী, আইপিএসের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের ভারতীয় প্রতিনিধিদল সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে। ভারতীয় প্রতিনিধিদলে বিএসএফের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছাড়াও দেশটির স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তারাও ছিলেন। চার দিনের সম্মেলন শেষে গতকালই ভারতীয় প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ ছাড়ার কথা জানিয়েছে বিজিবি সদর দপ্তর।
