আসন্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন ঘিরে ক্যাম্পাসে এখন উৎসবের আমেজ। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিতব্য এ নির্বাচন সামনে রেখে প্রথম ছাত্র সংগঠন হিসেবে ১০ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। গতকাল বৃহস্পতিবার ঐতিহাসিক বটতলায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান তাদের ১০ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেন।
এদিকে ডাকসু নির্বাচনের দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করেছে সেনাবাহিনী। গতকাল আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়, সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে এসব নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা প্রদান করা হয়নি এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো দায়িত্বে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ নেই।
এর আগে চিফ রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন জানিয়েছিলেন, ডাকসু নির্বাচনের দিনে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং ভোট গণনার সময় সেনাসদস্যরা ভোটকেন্দ্রে থাকবেন।
তিনি বলেছিলেন, আসন্ন ডাকসু নির্বাচন সুন্দর ও স্বচ্ছ করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তার বিষয়টা আমাদের জানিয়েছেন এবং তার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বলেছি, নিরাপত্তার ইস্যুতে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে আমরা সেনাবাহিনীকে সাহায্যের কথা জানাব।
তবে তার এমন বক্তব্যের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ডাকসু নির্বাচনের প্রার্থীরা। ভিপি প্রার্থী উমামা ফাতেমা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে সেনা মোতায়েন সত্যিই লজ্জাজনক। একই অভিযোগ করেন সাদিক কায়েমও।
সাবেক নেতারাও এর বিরোধিতা করেন। সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, সত্তর ও আশির দশকে সামরিক শাসনের মধ্যেও ডাকসু নির্বাচন হয়েছে, কিন্তু কখনো সেনা মোতায়েন হয়নি। সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুশতাক হোসেন মনে করেন, ক্যাম্পাসে সেনা উপস্থিতি বরং অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
ছাত্রদলের ইশতেহার : ১. শিক্ষা ও গবেষণাকে প্রাধান্য দিয়ে আধুনিক আনন্দময় বসবাসযোগ্য নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়ে তোলা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকাকালে সময়টা যেন প্রতিটি ছাত্রছাত্রী তাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান, শিক্ষণীয় এবং একই সঙ্গে আনন্দময় সময় হিসেবে মনে রাখতে পারে, সেই লক্ষ্যে সৃজনশীল উদ্যোগ গ্রহণ; ২. নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ক্যাম্পাস নারী স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি। নারী শিক্ষার্থীদের পোশাকের স্বাধীনতা যৌন হয়রানি প্রতিরোধ এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা; ৩. শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্য বীমা নিশ্চিত করা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাগ্রহণ ও চলাচল সহজতর করা; ৪. কারিকুলাম অবকাঠামো ও পরীক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং গবেষণার মানোন্নয়ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স কারিকুলাম আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে কি না, সেটি নিয়মিত পর্যালোচনার জন্য ছাত্র-শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞ সমন্বয় কমিটি গঠন করা; ৫. পরিবহন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ব্যাটারিচালিত সাটল সার্ভিস প্রচলন এবং যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে পরিবেশবান্ধব ব্যাটারিচালিত পর্যাপ্ত পরিমাণ শাটল সার্ভিস চালু করা। ঢাকার বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে সংযুক্ত শিক্ষার্থী বাস এবং বাস রুটের সংখ্যা ও পরিসর যৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি করা; ৬. হয়রানিমুক্ত প্রশাসনিক সেবা শিক্ষা ঋণ এবং ক্যাম্পাসভিত্তিক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। রেজিস্ট্রার ভবনের ‘লাঞ্চের পরে আসেন’ কালচার দূর করে ভবনের সার্বিক কার্যক্রম হয়রানিমুক্ত আধুনিক এবং গতিশীল করার লক্ষ্যে সার্টিফিকেট ও ট্রান্সক্রিপ্ট উত্তোলন নানাবিধ ফি প্রদানসহ যাবতীয় প্রশাসনিক কার্যক্রমকে ধাপে ধাপে ডিজিটালাইজ করা এবং ডিজিটাল সার্ভিস সমস্যার জন্য ডিজিটাল সাপোর্ট ডেস্ক তৈরি করা; ৭. তরুণদের গঠনমূলক কাজে সম্পৃক্তকরণ এবং ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বৃদ্ধি। বৈচিত্র্যময় এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাঙ্গন করতে নৃগোষ্ঠীর ভাষা সংস্কৃতি চর্চা উৎসাহিত করা; ৮. শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল সুবিধা সাইবার সিকিউরিটি এবং সাইবার বুলিং প্রতিরোধ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত অ্যাকাডেমিক ইমেইল আইডির স্টোরেজ লিমিট বৃদ্ধি অ্যাকাউন্টের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং তা ব্যবহার করে বিশ্বমানের অনলাইন জার্নাল ও লাইব্রেরি একসেস নিশ্চিত করা এবং সব ছাত্রছাত্রীকে বিনামূল্যে ক্লাউড স্টোরেজ প্রদান; ৯. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিবেশ সংরক্ষণ সবুজায়ন ও প্রাণীবান্ধব ক্যাম্পাস তৈরি; ১০. কার্যকর ডাকসু এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পৃক্ততা বৃদ্ধিকরণ।
ভোটদানে ভোটার পাবেন ৮ মিনিট : আসন্ন ডাকসু নির্বাচনে প্রতিটি ভোটার সর্বোচ্চ ৮ মিনিট সময় পাবেন। চিফ রিটার্নিং অফিসার অধ্যাপক ড. জসীম উদ্দিন জানিয়েছেন, মোট আটটি কেন্দ্রে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ হবে। তিনি বলেন, কেন্দ্র সংখ্যা ছয় থেকে আট করা হয়েছে। আপাতত আরও বাড়ানো হচ্ছে না। স্ক্যানিং মেশিনে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশের চেষ্টা থাকবে। রিটার্নিং অফিসার গোলাম রব্বানী বলেন, ভোটের মাঠ স্বচ্ছ রাখতে প্রশাসনের সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। আচরণবিধি লঙ্ঘন হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভোটকেন্দ্র বাড়ানোর দাবি : বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের প্যানেল ‘বিনির্মাণ পরিষদ’ দাবি করেছে, বর্তমান ৪০ হাজার ভোটারের জন্য মাত্র আটটি ভোটকেন্দ্র যথেষ্ট নয়। তাদের মতে, একজন শিক্ষার্থীর ভোট দিতে কমপক্ষে পাঁচ মিনিট সময় লাগবে, ফলে দীর্ঘ লাইন তৈরি হবে এবং অনেকেই ভোট দিতে নিরুৎসাহিত হবেন। তাদের দাবি, ভোটকেন্দ্রের স্বল্পতা ফল প্রকাশেও বিলম্ব ঘটাতে পারে। প্রশাসনকে দ্রুত কেন্দ্র বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্যানেলটির প্রার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয় হবে মাল্টিকালচারাল সেন্টার : ছাত্রশিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের ভিপি প্রার্থী আবু সাদিক কায়েম বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়কে মাল্টিকালচারাল সেন্টারে পরিণত করব, যেখানে সবাই মুক্তভাবে ধর্মচর্চা করতে পারবে। এটি হবে একটি মাল্টিকালচারাল ইনস্টিটিউশন। এখানে হিন্দু-বৌদ্ধ, চাকমা-মারমাসহ সবাই মুক্তভাবে তাদের ধর্মচর্চা করতে পারবে।
তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিয়ে অভিযোগ করে বলেন, আমরা প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ দেখে আশঙ্কা প্রকাশ করছি। তারা বারবার আমাদের হতাশ করছেন। আমরা তাদের কাছ থেকে স্বচ্ছতা আশা করি।
জিএস প্রার্থী এসএম ফরহাদ বলেন, আমরা যেসব পোস্টার লাগিয়েছি, সেগুলো নিয়ম মেনেই লাগিয়েছি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হঠাৎ করে নিয়ম বদলানোয় ঝামেলা বেধেছে।
