জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মাসউদ ইমরান মান্নুর আমন্ত্রণটা লোভনীয় ছিল। জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটি অব ফরেইন স্টাডিজের অধ্যাপক ড. মাসাহিকো তোগাওয়া বাংলাদেশের চট্টগ্রামের একটি গ্রামের নিরিখে শিক্ষায় ইসলামাইজেশন ও সেক্যুলারাইজেন নিয়ে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করবেন, গেলাম সকাল সকাল ঘুম ভেঙে সেটি শুনতে। দুর্দান্ত সেমিনারটি নানা প্রসঙ্গ তর্ক-বিতর্কে দারুণ আনন্দপূর্ণ হয়ে উঠল। তোগাওয়ার পাণ্ডিত্য আর পর্যবেক্ষণে উঠে এলো বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জ্ঞানতাত্ত্বিক অনেক প্রসঙ্গও।
তবে আয়োজনটি অভূতপূর্ব হয়ে উঠল প্রত্নতত্ত্বের ৫০তম আবর্তনের হেরিটেজ ফেস্ট বা ঐতিহ্য উৎসবে। বিভাগের শিক্ষার্থীরা লিগাল ইস্যুজ ইন আর্কিওলজি কোর্সের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রায় সব জিআই বা ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য অর্থাৎ নিজ নিজ এলাকার বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত খাবার হাজির করেছিলেন, পরে এসেছিলেন নিজের নিজের এলাকার পোশাক। একটা গোটা বাংলাদেশ যেন হাজির হয়েছিল প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ জুড়ে। কী নেই সেখানে। রাজশাহীর আম থেকে বরিশালের আমড়া, কুড়িগ্রামের শুক্তানি কিংবা আলুঘাঁটি, উলিপুরের ক্ষীরমোহন, ফেনীর ছিটপিঠার সঙ্গে আঁখের রাব, যশোরের খেজুর গুড়, পদ্মার ইলিশ, দিনাজপুরের কাটারিভোগ চালের ভাত, নরসিংদীর কাওনের পায়েস, বগুড়ার দই, কুমিল্লার রসমালাই, পদ্মার ইলিশ, মুক্তাগাছার মণ্ডা কী নেই!
শিক্ষক অতিথিদের শিক্ষার্থীরা যখন পাত বেড়ে দিচ্ছিলেন সিঁদুরে হাত রাঙিয়ে কলাপাতায় প্রত্যেকের শৈশব যেন নাড়া দিচ্ছিল তাদের হৃদয়ে, আর জিভ ত থৈ থৈ থৈ। বিভাগের শিক্ষক প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ সুফি মোস্তাফিজুর রহমান যেমন খই আর মুড়কি খেতে খেতে বলছিলেন, মনে হচ্ছে ছেলেবেলার মামাবাড়িতে ফিরে গেছি। নীলফামারীর ডোমারের সন্দেশ, নাটোরের কাঁচাগোল্লা আর উচ্চমূল্যের পদ্মার ইলিশ, এক সময় খেতে খেতে সবারই পেট ভরা কিন্তু মন আনচান, কত কিছু বাদ রয়ে গেল!
প্রত্যেক শিক্ষার্থীই নিজের এলাকার বৈশিষ্ট্যমন্ডিত খাবার বা জিআই হয়েছে কিংবা হবে, এমন খাদ্যবস্তুটি এই আয়োজনে নিয়ে এসেছেন, কেউ কেউ বানিয়েছেন মাকে দিয়ে, কিন্তু স্বাদ আর মানের ব্যাপারে হেরফের করেননি কেউ। ড. মাসাহিকো তোগাওয়া আশ্চর্য হয়ে বলছিলেন, অনেক অজানা খাবার খেলাম, বাংলাদেশের এই বৈচিত্র্য সারা পৃথিবীতেই খুবই আলাদা করে তুলে ধরা কিন্তু জরুরি।
খাবারদাবারের পাশাপাশি আয়োজনে আলাদা উৎসবের রঙ দিয়েছে শিক্ষার্থীদের সাজপোশাক। প্রত্যেকে নিজের নিজের এলাকার পোশাক পড়ে এসেছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম বিপ্লবী বরিশালের মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত সাজা ৫০তম ব্যাচের এক শিক্ষার্থীকে দেখে তো হাসিই লুকিয়ে রাখা দায় হলো সবার। সে নিয়ে এসেছে লবণ-মরিচ সমেত বরিশালের আমড়া, হাসির উদ্রেক হওয়ার কারণ, সে পাঞ্জাবি ধুতির সঙ্গে একটা নকল গোঁফ পড়েছে, গলায় ঝুলিয়েছে একটা অশ্বিনী কুমার দত্তের লেমিনেট করা ছবি, মনু না চিনিয়া যাইবা কনে!
জিআই পণ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দেশে ও দেশের বাইরে লড়ে যাচ্ছেন প্রতœতত্ত্ববিদ, লেখক অধ্যাপক মাসউদ ইমরান মান্নু। বাংলাদেশের রসমালাই ও জামদানি শাড়ির জিআই পেতে তার গবেষণার রয়েছে সক্রিয় ভূমিকা। টাঙ্গাইল শাড়ির ‘জিওগ্রাফিক ইন্ডিকেশন’সহ বাংলাদেশের জিআই সংগ্রামে এক বড় নাম মাসউদ ইমরান মান্নু, তার কোর্সের অংশ হিসেবে এই ঐতিহ্যের উদযাপন তাই একটা নতুন বার্তা দেয় যে, শিক্ষার্থীরাই শুধু নয়, জাতি হিসেবেও বাঙালি চিনবে এই খাদ্য পণ্যগুলোকে, চিনবে নিজেদের বৈশিষ্ট্য।
প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলছিলেন, ‘শিক্ষার্থীরা যে নিজেদের শেকড়ের সঙ্গে এই যূথবদ্ধতা বা যোগাযোগ তৈরি করল, নিজেদের উদযাপন করল নিজেদের চিনতে চিনতে, এটাই আসলে এই আয়োজনের উদ্দেশ্য, নিজেদের মানে আপনাকে চিনতে পারলেই তো চেনা যায় দেশকে, নিজের বৈশিষ্ট্য জানান দেওয়া যায় বিশ্বকেও, শিক্ষার্থীরা এবং বিভাগের শিক্ষকদের সবাইকে আমি ধন্যবাদ জানাই এই আয়োজনকে সফল করার জন্য এবং আমি মনে করি আমাদের জাতীয় পরিসরে, গণমাধ্যমে এই আলাপগুলো তুলে ধরে নিজেদের সব জিআই পণ্যের জিওগ্রাফিক ইন্ডিকেশন পেতে সহায়তা করা উচিত।’
আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের দশটি পণ্য জিআই সনদ অর্জন করলেও এখনো অন্তত ৫০-এর বেশি অভ্যন্তরীণ জিআই পণ্য আমাদের রয়েছে, যেসব জিআই সনদ অর্জন করতে পারে।
