বিনা নোটিসে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের পুনর্বহাল, যৌক্তিক বেতন, ওভারটাইমের মজুরি পরিশোধসহ ২৩ দফা দাবিতে চারদিন ধরে আন্দোলন করে আসছিলেন উত্তরা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) এভারগ্রিন প্রোডাক্টস ফ্যাক্টরি (বিডি) লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা। শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে গত সোমবার রাতে পরচুলা তৈরির কারখানাটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে কর্র্তৃপক্ষ। গতকাল মঙ্গলবার সকালে শ্রমিকরা কাজে যেতে চাইলে ইপিজেডের মূল ফটকেই তাদের আটকে দেওয়া হয়। প্রতিবাদে শ্রমিকরা নীলফামারী-সৈয়দপুর মহাসড়ক অবরোধ করেন। ‘পরিস্থিতি’ বিবেচনায় ইপিজেডের অভ্যন্তরের অন্য কোম্পানিগুলোও অনির্দিষ্টকালের ছুটি ঘোষণা করে। এত শ্রমিকরা আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী ও পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে সংঘর্ষ শুরু হয় শ্রমিকদের সঙ্গে। দফায় দফায় সংঘর্ষের এক পর্যায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন এক শ্রমিক। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন আরও ৭ জন। তাদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
নীলফামারী সদর থানার ওসি এম আর সাঈদ জানান, নিহত শ্রমিকের নাম হাবিব ইসলাম (২০)। তিনি সদর উপজেলা সংগলশী ইউনিয়নের কাজিরহাট মাছিরচাক গ্রামের দুলাল হোসেনের ছেলে এবং উত্তরা ইপিজেডের ইকু ইন্টারন্যাশনাল (স্পিনিং অ্যান্ড কম্পোজিট) কোম্পানির কর্মী ছিলেন।
এদিকে নীলফামারী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ফারহান তানভিরুল ইসলাম হাবিবের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, এ ঘটনায় হাতে ও পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহতদের মধ্যে তিনজনকে (শাহিন, লিপি আক্তার ও শামীম হোসেন) রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। অপর আহত মো. মোমিনুর রহমান, নুর আলম, মোস্তাক আহমেদ ও জমিলা খাতুনকে নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এদিকে আন্দোলন, বিক্ষোভ ও সংঘর্ষে সকাল ৭টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত নীলফামারী জেলা থেকে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ ছিল। পরে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারের হস্তক্ষেপে ২টা ২০ মিনিটে সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়।
এদিকে বিকেলে হাবিব ইসলামের লাশ ময়নাতদন্ত না করেই গ্রামে নিয়ে যান গ্রামবাসী। পথে ইপিজেডের প্রধান ফটকের সামনে শ্রমিকরা তাদের সহকর্মী হাবিবের মরদেহ বহনকারী গাড়ি থামান। সেখানে প্রায় দুই ঘণ্টা অবস্থান করেন তারা। সে সময় অবশ্য কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। সেখানে হাবিবের বাবা দুলাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার কোনো দাবি নেই। আমি কোনো মামলা করতে চাই না। আমার ছেলের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করতে চাই।’
এ বিষয়ে ওসি এম আর সাঈদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইনগতভাবে লাশ দাফনের জন্য আমরা তাদের অনুরোধ করেছি। নিহত হাবিবের সহকর্মী মিলন ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানান, তারা দুজনে রাত ৮টার দিকে নাইট ডিউটিতে ইপিজেডে ঢোকেন। তারা দুজনে ইকু ইন্টারন্যাশনাল (স্পিনিং অ্যান্ড কম্পোজিট) কোম্পানির শ্রমিক। সারা রাত কাজ করে সকাল সাড়ে ৭টায় কারখানা থেকে বের হন। ইপিজেডের প্রধান ফটক অতিক্রম করার সময় সকাল ৮টা থেকে ৮টা ১৫ মিনিটের মধ্যে গুলির শব্দ পান। প্রথমে একটি গুলি করা হয়, এরপর ৬/৭ বার গুলি হয়। তখনই হাবিব গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
এভারগ্রিনের শ্রমিক আখি আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি ১০ বছর ধরে এই কোম্পানিতে কাজ করছি। যেকোনো প্রতিষ্ঠানের একটি নিয়ম থাকে, কোনো শ্রমিককে ছাঁটাইয়ের আগে তাকে নোটিস প্রদান ও ছাঁটাইয়ের সময় তার কাজের কিছু পরিমাণ টাকা প্রদান। কিন্তু এই (এভারগ্রিন) প্রতিষ্ঠানটির কোনো নিয়ম নেই। তারা ইচ্ছেমতো হঠাৎ করে শ্রমিকদের বের করে দেয়।’
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার পর কোনো টাকা-পয়সা না দিয়ে আমাকে যদি বের করে দেওয়া হবে তবে সেটা কি অন্যায় নয়? আমরা ন্যায্য বেতন-ভাতা চাই, সেটি আমাদের দিতে হবে।’
অপর শ্রমিক জুঁথি আক্তার বলেন, ‘সকালে ডিউটিতে এসে দেখি গেট বন্ধ। এর কিছুক্ষণ পরই আমাদের ওপর গুলি চালানো হয়। একজন ভাই মারা গেলেন, এর জবাব কে দেবে?’
ভেনচুরা লেদার ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের শ্রমিক সাদিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি নাইট ডিউটি শেষে সকাল ৬টা ১০ মিনিট পর্যন্ত ভেতরে ছিলাম। তখনো গেট খোলা ছিল। এর মধ্যেই সেনাবাহিনী ভেতরে প্রবেশ করে গেট বন্ধ করে দেয়। ধীরে ধীরে লোকজনের ভিড় বাড়তে থাকে। আমি সাড়ে ৮টা পর্যন্ত ঘটনাস্থলে ছিলাম। হঠাৎ করে পুলিশ-সেনাবাহিনী ধাওয়া শুরু করে। এতে আমাদের এক শ্রমিক ভাই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়।’
নিহত হাবিবের মেজ ভাই আশিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা তিনভাই। বড় ভাই বিজিবিতে চাকরি করে। হাবিব ছিল সবার ছোট। সে ইকু ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি নিটিং কারখানায় রাতে কাজ করেছেন। সকালে কাজ শেষে ইপিজেড থেকে বের হওয়ার সময় গুলিতে আমার ভাই নিহত হন।’
এদিকে এ ঘটনার পর দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান, পুলিশ সুপার এ এফ এম তারিক হোসেন খান, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মীর সেলিম ফারুক, সদস্য সচিব এএইচএম সাইফুল্লাহ রুবেল, জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. খায়রুল আলম।
ডা. খায়রুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা এভারগ্রিন কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে শ্রমিকদের দাবি নিয়ে কথা বলেছিলাম। তারা আশ্বাসও দিয়েছিল শ্রমিকরা কর্মস্থলে ফিরে এলে তাদের দাবি পূরণ করা হবে। কিন্তু তারা রাতে কারখানা বন্ধের নোটিস দেওয়ায় সকালে শ্রমিকরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তারা কর্মস্থলে যোগদানের জন্যই সকালে গিয়েছিলেন।
এ ঘটনার বিষয়ে এভারগ্রিন কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
নীলফামারী ব্যাটালিয়ন ৫৬ বিজিবির লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম বদরুদ্দোজা সাংবাদিকদের বলেন, উত্তরা ইপিজেডের ঘটনায় পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবি দুই প্লাটুন জওয়ান যৌথভাবে কাজ করে। পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এ বিষয়ে ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার সাংবাদিকদের বলেন, ছাঁটাইকৃত শ্রমিকরা তাদের পাওনা ঠিকমতো না পাওয়ায় এই আন্দোলন সৃষ্টি হয়। শ্রমিকদের সঙ্গে আমরা কয়েকদফা কথা বলার চেষ্টা করেছি। তাদের মধ্যেও বিভাজন থাকায় এক পক্ষ রাজি হলেও অপর পক্ষ আলোচনায় না আসার কারণে ওই পক্ষ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান বলেন, এভারগ্রিনের শ্রমিকরা আর্থিক সমস্যা ও বিভিন্ন দাবি নিয়ে আন্দোলন করছিলেন। একটি টেকনিক্যাল সমস্যার কারণে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
