জাকসুর ভিপি প্রার্থী অমর্ত্যর প্রার্থিতা বাতিল অবৈধ দাবি সম্প্রীতির ঐক্য প্যানেলের

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১১:১১ পিএম

আসন্ন জাকসু নির্বাচনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ভোটার ও প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য বিবেচিত হওয়ায় সম্প্রীতির ঐক্য প্যানেলের সহ-সভাপতি (ভিপি) প্রার্থী অমর্ত্য রায় জনকে ভোটার ও প্রার্থী তালিকা থেকে বাদ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ওই বিজ্ঞাপ্তিকে অবৈধ ও নিয়মবহির্ভূত বলে দাবি করেছে প্যানেলের সদস্যরা।

শনিবার (৬ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে নয়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় এক সংবাদ সম্মেলন করে এ দাবি করেন তারা।

নির্বাচনের কমিশনের দেওয়া ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের যথাযথ কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে ২০১৭-২০১৮ শিক্ষাবর্ষে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থী অমর্ত্য রায় জন, আ ফ ম কামালউদ্দিন হল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) এর গঠনতন্ত্রের ৪, ৩৮ ধারা মোতাবেক ভোটার ও প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য বিবেচিত হওয়ায় ভোটার ও প্রার্থী তালিকা হতে তার নাম প্রত্যাহার করা হলো।

জাকসুর গঠনতন্ত্রের ৪ ধারায় বলা আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল নিয়মিত ও বৈধ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-সংসদের সদস্য বলে গণ্য হবেন। কেবল তারাই ভোটার বলে বিবেচিত হবেন এবং শিক্ষার্থী সংসদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।

তবে এক্ষেত্রে কিছু শর্তও আরোপ করা আছে। সেগুলো হলো—জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সকল শিক্ষার্থী স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে ৬ (৪+২) বছর এবং/অথবা স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে ২ (১+১) বছর ধরে অধ্যয় করছেন, কেবল সে সকল শিক্ষার্থীর নাম জাকসু ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।

তবে ফার্মেসি বিভাগের স্নাতক (সম্মান) কোর্সের মেয়াদ ৫ বছর হওয়ায় শিক্ষার্থীদের স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে (৫+২) ৭ বছর যাবৎ অধ্যয়ন করার অনুমতি রয়েছে। চারুকলা বিভাগে স্নাতকোত্তর শ্রেণির মেয়াদ ১.৫ বছর হওয়ায় তাদের (২+১) ৩ বছর যাবৎ অধ্যয়ন করার অনুমতি রয়েছে। সে কারণে ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থীগণ স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে ৭ বছর এবং চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে ৩ বছর মেয়াদ পাবে। পরবর্তী সময়ে অন্য কোনো বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে স্নাতক/স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষাবর্ষের কাল বৃদ্ধি ঘটলে সে ক্ষেত্রেও অনুরূপ সুযোগ প্রযোজ্য হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত এমফিল, পিএইচডি, উইকেন্ড ও ইভিনিং প্রোগ্রামের শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন ব্যাচের অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের নাম জাকসুর ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। ইনস্টিটিউট অব রিমোট সেনসিং এন্ড জিআইএস-এর শিক্ষার্থীগণ বিশেষায়িত মাস্টার্সে অধ্যয়ন করায় তারা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবেন না।

এছাড়া যে সকল শিক্ষার্থী আইবিএ-জেইউতে নিয়মিত কোর্সে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে অধ্যয়ন না করেও মাস্টার্সে (স্নাতকোত্তর) শ্রেণিতে অধ্যয়ন করছে তারা জাকসু নির্বাচনে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন না।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সম্প্রীতির ঐক্য প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) শরণ এহসান। এসময় তিনি বলেন, আজ বিকেলে নির্বাচন কমিশন "সম্প্রীতির ঐক্য" প্যানেলের সহ সভাপতি পদপ্রার্থী অমর্ত্য রায়ের প্রার্থীতা বাতিল করে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে, যা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং নিয়মবহির্ভূত। চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের ৮ দিন পরে প্রার্থীতা বাতিলের সিদ্ধান্ত জাকসু নির্বাচনকে ঘিরে এক প্রকার ষড়যন্ত্রের আভাস দেয়।

শরণ এহসান বলেন, খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয় ১৭ আগস্ট এবং হালনাগাদ করা হয় ২৯ আগস্ট। চূড়ান্ত প্রার্থী ও ভোটার তালিকায় অমর্ত্য রায় জনের নাম ছিল কিন্তু পরবর্তীতে তার প্রার্থীতা বাতিল করা হয়। নির্বাচন কমিশনের এমন পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে হুমকিস্বরূপ এবং যেকোন প্রার্থীর বিরুদ্ধে যেকোন সময় ব্যবহৃত হতে পারে।

আওয়ামী আমলে ২০২৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রাফীতি মোছার দায়ে অমর্ত্য রায়কে ১ বছর এর জন্য বহিষ্কার করা হয়। পরবর্তীতে মহামান্য হাইকোর্ট ২১ মার্চ ২০২৪ তারিখে কেবল ফাইনাল পরীক্ষা দেয়ার অনুমতি প্রদান করে। কিন্তু ক্লাস ও ল্যাব পরীক্ষা এবং হলে অবস্থান করার অনুমতি দেয়নি। বহিষ্কারাদেশ বহাল থাকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। এই দশ মাস তার যেসকল ক্লাস, বিশেষত ল্যাব ক্লাস এ অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হয়েছে, তার ক্ষতি পূরণের জন্য পুনরায় ক্লাসে নিয়মিত অংশ গ্রহণের সুযোগ পাওয়ার কথা।

তিনি বলেন, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ৪০৮ নং কোর্সটি একটি প্র্যাকটিক্যাল কোর্স। যেহেতু বহিষ্কারের সময় অমর্ত্য রায়ের ক্লাস, টিউটোরিয়াল পরীক্ষা কিংবা ল্যাব ক্লাসে অংশগ্রহণ করা নিষেধ ছিল, সেহেতু তিনি ইনকোর্স নাম্বার ছাড়া এবং ল্যাব ক্লাসে অংশগ্রহণ না করেই রিটেক ফাইনাল পরীক্ষা দেন। ফলে তিনি ৪০৮ নাম্বার কোর্সে আবারও অকৃতকার্য হন।

তিনি আরও বলেন, শেখ মুজিবের গ্রাফিতি মোছায় নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী এনামের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রশাসন অমর্ত্য রায় জনকে বহিস্কার করে। উক্ত আন্দোলনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সোহেল আহমেদ, লুৎফুল এলাহী, মোতাহার হোসেন এবং শিক্ষার্থী আবদুর রধিদ জিতু সংহতি জ্ঞাপন করে। প্রসঙ্গত এবং জরুরি বিষয় যে, উক্ত শিক্ষকদের মধ্যে একজন বর্তমান উপ-উপাচার্য, একজন নির্বাচন কমিশনের সদস্য এবং আব্দুর রশিদ জিতু ভিপি পদে অমর্ত্য রয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী। এখানে স্পষ্ট যে, অমর্ত্যর প্রার্থীতা বাতিলের সিদ্ধান্ত পক্ষপাতদুষ্ট, ষড়যন্ত্রমূলক এবং কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট এর ব্যাত্যয়।

শরণ এহসান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে ১৭ আগস্ট এ প্রকাশিত ভোটার তালিকায় অমর্ত্য রায়ের নাম ছিল। পরবর্তীতে ২৯ আগস্ট প্রকাশিত চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকায়ও তার নাম ছিল। কিন্তু আজ নোটিস আসার পর আমরা দেখতে পাচ্ছি ওয়েবসাইটে যে ভোটার তালিকার ফাইলটা রয়েছে, সেটি হুট করে পরিবর্তন করে ফেলা হয়েছে এবং তাতে অমর্ত্য রায়ের নাম নেই। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, নতুন তালিকায় কোনো সংশোধন করার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয় নি। এতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এর স্পষ্ট জালিয়াতি লক্ষ্য করা যায়।

তিনি আরও বলেন, চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর নির্বাচনের চার দিন আগে এমন সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের ইচ্ছাকৃত গাফিলতি ও প্রতারণা। চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকায় অমর্ত্য রয়ের নাম থাকায় নির্বাচনী প্রস্তুতির সকলকিছু সেভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এমতবস্থায়, পর্যাপ্ত সময় থাকা সত্ত্বেও এতোদিন পার হয়ে যাওয়ার পর নির্বাচনের চার দিন আগে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন "সম্প্রীতির ঐক্য" পর্যদ ও ভোটারদের সাথে প্রতারণার স্বরূপ। আমরা বলতে চাই, প্রশাসন নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে, পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করেছে। একইরকম আচরণের যে পুনরাবৃত্তি যে অন্য কোনো প্রার্থীর ক্ষেত্রে ঘটবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তকে জাকসু বানচালের পাঁয়তারা আখ্যা দিয়ে শরণ এহসান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ সম্পূর্ণ ভাবে জাকসু নির্বাচনকে বানচাল করার পাঁয়তারা। চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি উপাচার্য বলেছিলেন যে, জাকসুর তফসিল ঘোষণা করলে ক্যাম্পাসে লাশ পড়বে। উপাচার্যের এমন বক্তব্য জাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে প্রশাসনের যে অনীহা, তারই বহিঃপ্রকাশ ছিল। কাজেই, জাকসু নির্বাচনে স্পষ্টত প্রতারণা, পক্ষপাতদুষ্টতা এবং অন্যায় হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা না নিলে আইনি লড়াইয়ের হুমকি দিয়ে তিনি বলেন, জাকসু নির্বাচনের এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের এরূপ আচরণের দ্রুত প্রতিকার করার জন্য মহামান্য আচার্যের কাছে আবেদন জানাই। জাকসু বানচালের ষড়যন্ত্র আমরা কোনোভাবেই মেনে নিবো না, প্রয়োজনে আমরা আইনী লড়াই লড়তে বাধ্য হব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত