জুলাই-আগষ্টে মানবতাবিরোধী অপরাধ, পুলিশের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলেন পুলিশ

‘চায়না রাইফেল দিয়ে গুলি করে হত্যার নির্দেশ দেন এডিসি আখতারুল’ 

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১১:৪০ পিএম

জুলাই-আগষ্টে সংঘটিত ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যূত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আরও তিনজন সাক্ষ্য দিয়েছেন। 

গতকাল সোমবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল- ১ এ এ সাক্ষ্য গ্রহণ হয়। সাক্ষ্য দানকালে পুলিশের উপ পরিদর্শক (এসআই) মো. আশরাফুল ইসলাম গত বছরের ৫ আগষ্ট রাজধানীর চানখারপুলে হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দেন। 

জবানবন্দির একপর্যায়ে তিনি বলেন, আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতাকে গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) শাহ্ আলম মো. আখতারুল ইসলাম। 

তিনি সেদিন পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন ‘তোমাদের যাদের কাছে পিস্তল, চায়না রাইফেল আছে, আন্দোলনকারীদের ফায়ার (গুলি) করে তাদেরকে মেরে ফেলো।’ যারা গুলি করতে অপারগতা প্রকাশ করেন তাদেরকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন পলাতক এই পুলিশ কর্মকর্তা। এ নিয়ে শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৩৯ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। 

গতকাল এ মামলায় আরও দুজন সাক্ষ্য দেন। তারা হলেন, জুলাই যোদ্ধা ও পুলিশের গুলিতে আহত চট্টগ্রাম কলেজের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ হাসান ও গাজীপুরের কাশিমপুরের বাসিন্দা ও স্থানীয় এলাকায় হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী মো. সোহেল মাহমুদ। এ দুজনকে জেরা করেন শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন। 

জবানবন্দিতে আশরাফুল ইসলাম বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের সময় গত বছরের ৫ আগষ্ট তিনি সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে চানখাঁরপুল এলাকায় দায়িত্ব পালন করছিলেন। তবে তিনি গুলি করা থেকে বিরত ছিলেন। তিনি বলেন, ওই দিন চানখাঁরপুল সংলগ্ন বংশাল ও চকবাজার এলাকা থেকে আসা ছাত্র-জনতা ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে যোগদানের উদ্দেশ্যে শাহবাগের দিকে যেতে চাইলে চানখারপুল মোড়ে এডিসি আখতারুলের নির্দেশে কোনো প্রয়োজন ছাড়া সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেলসহ ছাত্র-জনতাকে লক্ষ্য করে শটগান দিয়ে গুলি করা হয়। 

এছাড়া এপিবিএন পুলিশ সদস্যদের দিয়ে শটগান ফায়ার করে ছাত্র- জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করা হয়। এ সময় ওই এডিসি আখতারুল পুলিশ সদস্যদের বলেন, ‘তোমাদের যাদের কাছে পিস্তল ও চায়না রাইফেল আছে, তারা আন্দোলনকারীদের প্রতি ফায়ার করে তাদেরকে মেরে ফেলো।’ 
সাক্ষী বলেন, আমিসহ কয়েকজন তার এই অবৈধ ও অপ্রয়োজনীয় আদেশ পালন করতে না চাইলে এডিসি আখতারুল অকথ্য ভাষায় আমাদের গালিগালাজ করে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘তোরা সরকারের বেতন রেশন খাস না? গুলি করবি না কেন? তোদের চাকরি থাকবেনা।’ এ হুমকির পরও আশরাফুল ইসলাম গুলি করা থেকে বিরত থাকেন। 

তিনি বলেন, এডিসি আখতারুলের নির্দেশনা ও দেখানো মতে কনস্টেবল নাসিরুল চায়না রাইফেলে গুলি লোড করেন এবং আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে বারবার ফায়ার (গুলি) করতে থাকেন। 

এ সময় এডিসি আখতারুল এপিবিএন পুলিশের কনস্টেবল অজয়ের হাত থেকে চায়না রাইফেল কেড়ে নিয়ে এপিবিএন পুলিশের কনস্টেবল সুজনের হাতে দেন। অজয় গুলি করা থেকে বিরত ছিলেন। কনস্টেবল সুজন হোসেন চানখাঁরপুল মোড়ে কখনো দাঁড়িয়ে, শুয়ে, কখনো হাঁটু গেড়ে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে চাইনিজ রাইফেল দিয়ে গুলি করতে থাকেন। এছাড়া এপিবিএনের তৎকালীন কনস্টেবল ইমাজ হোসেন ইমন তাঁর নামে ইস্যুকৃত চায়না রাইফেল দিয়ে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি করেন। 

সাক্ষী বলেন, একপর্যায়ে তিনি দেখতে পান এসব গুলিতে বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে গেলে আন্দোলনকারী অন্যরা তাঁদের ধরাধরি করে নিয়ে যাচ্ছেন। আজ মঙ্গলবার সাক্ষী আশরাফুলকে জেরার দিন ধার্য করে ট্রাইব্যুনাল। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত