আগের দুদিনের মতো ছিল না কাঠমান্ডুর চিত্র। তবে এ চিত্রও বড্ড অপরিচিত দেবেন্দ্র মহারজনের কাছে। ৩৫ বছরের এই ব্যক্তি চাকরি করেন একটি বেসরকারি টেলিফোন কোম্পানিতে। কারফিউর কারণে অফিস যেতে হয়নি। তবে নিজের শহরের অচেনা রূপ দেখতে ঠিকই ঘর থেকে বের হয়েছিলেন। ললিতপুরের রাজপথ লাগোয়া এক গলিতে দাঁড়িয়ে উৎসুক হয়ে দেখছিলেন টহলরত সেনাবাহিনীর সৈনিকদের। গাড়ি-ঘোড়াশূন্য রাজপথ যে খুব বেশি দেখার সুযোগই হয়নি কাঠমান্ডুবাসীর। একটু শঙ্কা ছিল, তারপরও উৎসুক মনকে দমিয়ে রাখতে পারেননি বলেই ছোট্ট স্কুটি নিয়ে প্রধান সড়ক এড়িয়ে অলিগলি চষে বেড়াচ্ছেন তিনি। বাংলাদেশের সংবাদকর্মী পরিচয় দিতেই আগ্রহ নিয়ে কথা বললেন এবং প্রথমেই জানতে চাইলেন কাঠমান্ডুতে আটকেপড়া বাংলাদেশি ফুটবলারদের কথা। এরপর অপরিচিত কাঠমান্ডু নিয়ে ভীতিকর অভিজ্ঞতার কথা বলে গেলেন দেবেন্দ্র, ‘বহু বছর ধরে এখানে আছি। এ রকম অবস্থা আগে কখনো দেখিনি এ শহরে। তরুণদের এতটা ভয়ডরহীন রূপ দেখে স্তম্ভিত হয়েছি। সবচেয়ে খারাপ লেগেছে ১৯ তাজা প্রাণ ঝরে যেতে দেখে।’ দেবেন্দ্রর কাছ থেকে জানা গেল সরকার পতন আন্দোলনে সফল হওয়ার পর জেন-জি প্রজন্ম এখন নতুন দাবিতে সোচ্চার হয়েছে। কেপি শর্মা ওলির পদত্যাগের পর টক অব দ্য টাউন হলো কে ধরবেন সরকারের হাল, কে দেখাবেন দিশা? তরুণরা অবশ্য আস্থা রাখছেন তরুণ নেতৃত্বে। প্রকৌশলী থেকে জনপ্রিয় র্যাপার, হুট করেই রাজনীতি এসে কাঠমান্ডু সিটি মেয়র বনে যাওয়া ৩৫ বছরের বালেন্দ্র শাহকে ওলির আসনে দেখতে চায় ছাত্র-জনতা।
প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির পদত্যাগের পর সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে দেশের শাসনভার এখন রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পৌদেলের হাতে। অরাজক পরিস্থিতি এড়াতে বুধবার ভোর থেকেই কাঠমান্ডুর রাজপথে অবস্থান নেয় সেনাবাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা। গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে সাঁজোয়া যানের উপস্থিতি দেখা যায়। কারফিউ ঘোষণার পর সকাল থেকেই পথেঘাটে কাউকে থাকতে দেওয়া হচ্ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কারফিউ হয় ঢিলেঢালা। তবে দোকানপাট খুব একটা খোলেনি। পুরো কাঠমান্ডু জুড়ে আগের দুদিনের তা-বের চিত্র বিদ্যমান ছিল ভালোভাবেই। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার রোষানলে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক অনেক স্থাপনা। যার অন্যতম সিংহ দরবার। ১২৫ বছর পুরনো সুবিশাল রাজমহলে ছিল সবকটি মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরই ছিল এখানে। বিক্ষুব্ধ জনতার হাত থেকে রেহাই পায়নি ঐতিহাসিক এই স্থাপনা। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরসহ অনেক মন্ত্রীর দপ্তর। তাদের বাসাবাড়িগুলোও পোড়ানো হয়েছে বাজেভাবে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কাঠমান্ডুর দাল্লু শহরে নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝালানাথ খানালের স্ত্রীকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার ঘটনা ঘটে। প্রধানমন্ত্রীসহ বেশিরভাগ মন্ত্রী ও রাজনীতিবিদের সুরক্ষার দায়িত্ব নিয়েছিল সে দেশের সেনাবাহিনী। ঝালানাথ খানাল রক্ষা পেলেও নিজ বাড়িতেই ছিলেন তার স্ত্রী। বিক্ষুব্ধ জনতা সেই বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করলে জ্যান্তু অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান রাজ্যলক্ষ্মী চিত্রকর।
তারুণ্যের বিজয় হলেও হেরে গেছে হিমালয় ঘেরা দেশটির অনেক কিছুই। ৬৫ বছরের বিশ্বশর্মা ঠাকরাল ৪০ বছর ধরে থামেল অঞ্চলে একটি স্যুভেনিরের দোকান চালান। কারফিউ বলে দোকান খুলতে পারেননি। তবে ফটকের সামনে মোড়া পেতে বসে ছিলেন প্রায় পুরোটা দিন। সেখানেই কথা হয় তার সঙ্গে। আফসোস নিয়ে বলেন, ‘সরকার ছিল ভীষণ দুর্নীতিবাজ। নেপালের সাধারণ মানুষের সামগ্রিক দাবি ছিল যাতে এই সরকারের পতন ঘটে। তবে সরকার পতনের নামে দুদিনে যা হয়েছে, সেই ক্ষতচিহ্ন বহুদিন বয়ে বেড়াতে হবে আমাদের। যেভাবে দর্শনীয় সব স্থাপনা ধ্বংসের খেলায় নেমেছিল ছেলেমেয়েরা সেটা দেখে ভীষণ কষ্ট পেয়েছি। এসব স্থাপনা আমাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতির ধারক হয়েছিল। ২০১৫ সালে ভয়াবহ ভূমিকম্পে এমনিতেই আমরা অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা হারিয়েছি। তরুণদের পাগলামিতে সিংহ দরবারের মতো স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলো। শুধু তাই নয়, এই ঘটনার প্রভাবে আসছে ভরা মৌসুমে আমরা অনেক পর্যটক হারাব। এতে দেশের অর্থনীতিতে বাজে প্রভাব পড়বে।’
তরুণদের ভাবনাটা ভিন্ন। তাদের দাবি, ভালো কিছুর জন্য কিছু ক্ষতি শিকার করতেই হবে। দ্যা লন্ডন কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র বিক্রম শ্রেষ্ঠা দুদিনই ছিলেন আন্দোলনের সম্মুখসারিতে। বাবার খাবারের ব্যবসার সুবাদে দুদিন বাদে বুধবার থামেলের রেস্টুরেন্টে দেখা মিলেছে তার। বিক্রম বললেন, ‘দেখুন, এই আন্দোলনটা কেবল সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধের জন্য নয়। আমরা পথে নেমেছিলাম দেশের ঘুণে ধরা রাজনীতির ধারক-বাহক রাজনীতিবিদদের একটা বার্তা দিতে। আপনি হয়তো জানেন না, এদের কারণে আমাদের প্রজন্মের কেউই আর নেপালে থাকতে চায় না। দ্বাদশ শ্রেণি কোনোমতে পার করেই আমাদের অনেক বড় ভাইকে দেখেছি উচ্চশিক্ষার লক্ষ্যে উন্নত দেশগুলোতে চলে যেতে। সেখান থেকে তারা আর ফিরতে চান না এ দেশে। কারণ এখানকার সরকার কখনোই আমাদের জন্য ভালো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে না। শুধু তাই নয়, সরকারে যারাই আসেন, তারাই ক্ষমতার অপব্যবহার করে টাকার পাহাড় বানান। আয়েশি জীবনযাপন করেন। আর সাধারণ মানুষকে প্রতিদিন মোকাবিলা করতে হয় দারিদ্র্যের। তাই আমাদের চাওয়া এমন একজন দেশের হাল ধরুন যিনি আমাদের চাওয়াটা জানেন এবং কাজ করতে চান। কাঠমান্ডুর সিটি মেয়র বালান শাহ যেমন। কোনো রাজনৈতিক দলে না গিয়ে তিনি একাই দেশ সংস্কারের জন্য লড়াই করছেন। এমন একজন মানুষকে আমরা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাই।’
নেপালবাসীর কাছে বালান শাহর পাদপ্রদীপের আলোয় চলে আসা ২০২২ সালে। এমনিতেই তরুণদের কাছে অনেক আগেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন অন্য পরিচয়ে। স্কুলজীবন থেকেই গান ছিল তার নেশা। নবম শ্রেণিতে থাকতে নিজের লেখা গানে সুর দেন এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করেন। তার দুটি অ্যালবাম তরুণ সমাজে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। নেপাল থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর ভারতের বেঙ্গালুরুতে গিয়ে নিয়ে আসেন সম্মান ডিগ্রি। এরপর দেশে ফিরে প্রকৌশল ক্যারিয়ারের পাশাপাশি গান-বাজনায় মনোনিবেশ করেন। র্যাপার হিসেবে জনপ্রিয়তা পান। তবে ২০২২ সালে তার জীবনে ঘটে বাঁকবদল। দুঁদে সব রাজনীতিবিদদের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বসেন কাঠমান্ডু সিটি মেয়র নির্বাচনে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টির দুই প্রার্থীকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে বনে যান মেয়র। শুরু হয় তার মূলধারার রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াই। দুর্নীতি, ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও সড়ক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা ঢেলে সাজাতে লড়াই চালিয়েছেন তিনি। জেন-জি প্রজন্ম সরকারবিরোধী আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করে এবং পেছন থেকে সমর্থন দিয়ে যান বালান। ফলে ওলি পতনের পর তরুণদের পছন্দের প্রথম নামটাই বালান শাহ।
শেষ পর্যন্ত নেপালে সত্যিকারের রাজনৈতিক সংস্কারের পর যোগ্য নেতৃত্ব আসবে কি না তা সময়ই হয়তো বলে দেবে। অগ্নিগর্ভ দেশটিও হয়তো ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তবে যে ক্ষতিটা হয়ে গেল তার রেশ থেকে যাবে অনেক দিন। সেটাই অনুন্নত দেশটির সাধারণের এখন সবচেয়ে বড় ভাবনার। পর্যটকদের জন্য ভীষণ পছন্দের কাঠমান্ডু শহরে ঘটা নানা ধ্বংসযজ্ঞে রেহাই পায়নি আবাসিক হোটেলও। আগুন দেওয়া হয়েছে পাঁচতারকা হোটেলে। শহরের ক্যাসিনোগুলোতে ঘটেছে ভয়ংকর লুটের ঘটনা। ভাটভাটানির মতো বড় বড় বিপণি বিতানগুলো লুটের পর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ সব কিছুই তারুণ্যের এই বিস্ফোরণকে করেছে প্রশ্নবিদ্ধ।
