স্কুল ঘিরে বাজারের আঁস্তাকুড়

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৭:৩৬ এএম

টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার ৬৮ নম্বর বল্লা ১ নম্বর প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বর্তমানে একটি অস্বাস্থ্যকর ও শিক্ষাবিরোধী পরিবেশে ডুবে আছে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অভিভাবকদের জন্য চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যালয়ের চারপাশে বল্লা বাজারের ময়লা-আবর্জনার স্তূপ, অপরিকল্পিত পাবলিক টয়লেটের তীব্র দুর্গন্ধ, লাকড়ির গাদা এবং অস্থায়ী ভাজাপোড়ার দোকানের কালো ধোঁয়া শিক্ষার পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলেছে। এ পরিস্থিতি কোমলমতি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করছে, যা শিক্ষার মান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।

সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে সীমানা প্রাচীর না থাকায় বাজারের আবর্জনা, যেমন প্লাস্টিকের ব্যাগ, কাগজ, উচ্ছিষ্ট খাবার এবং অন্যান্য বর্জ্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। প্রতিদিন বল্লা বাজারের ব্যবসায়ীরা তাদের দোকানের ময়লা বিদ্যালয়ের কাছাকাছি ফেলে রাখছেন, যার ফলে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পুরো এলাকা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। এই দুর্গন্ধ শিক্ষার্থীদের ক্লাসে মনোযোগ দেওয়া কঠিন করে তুলছে এবং শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি, এবং অন্যান্য শ্বাসযন্ত্রের সমস্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিদ্যালয় ছুটির সময় বা বন্ধের দিনে কিছু বহিরাগত ব্যক্তি বিদ্যালয়ের মাঠে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিচ্ছেন, যা পরিবেশকে আরও অস্বাস্থ্যকর করে তুলছে।

বিদ্যালয়ের পাশে একটি পরিত্যক্ত ভবন মাদকসেবীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, সন্ধ্যার পর এই ভবনে মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায় এবং তারা প্রকাশ্যে মাদক সেবন করে। এ পরিস্থিতি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে এবং অভিভাবকদের মধ্যে চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অভিভাবক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা আমাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ভয় পাই। মাদকসেবীদের উপস্থিতি এবং ময়লার দুর্গন্ধ আমাদের বাচ্চাদের জন্য বিপজ্জনক। প্রশাসনের উচিত এখানে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।’

বিদ্যালয়ের দুপাশে সীমানা প্রাচীরের কিছু অংশ ভাঙা থাকায় স্থানীয় লাকড়ি ব্যবসায়ীরা সেখানে বিশাল লাকড়ির স্তূপ জমা করছেন। এই স্তূপ থেকে ধুলোবালি ও কীটপতঙ্গ ছড়াচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য অস্বাস্থ্যকর।

এ ছাড়া বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে অস্থায়ী ভাজাপোড়ার দোকান থেকে উৎপন্ন কালো ধোঁয়া পরিবেশকে আরও দূষিত করছে। এই ধোঁয়া শিক্ষার্থীদের শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা সৃষ্টি করছে এবং ক্লাস চলাকালে শিক্ষকদের পাঠদানে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। স্থানীয় অভিভাবক নাসিমা বেগম বলেন, ‘এই ধোঁয়া ও ময়লার কারণে আমার মেয়ের শ্বাসকষ্টের সমস্যা বেড়েছে। আমরা চাই বিদ্যালয়ের পরিবেশ নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর হোক।’

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘এই সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। বিদ্যালয়টি বাজারের মধ্যে অবস্থিত হওয়ায় ময়লা-আবর্জনা ও দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। সীমানা প্রাচীরের অভাবে বহিরাগতরা বিদ্যালয়ের মাঠে মলমূত্র ত্যাগ করে। এ ছাড়া বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যসম্মত নলকূপ না থাকায় শিক্ষার্থীরা নিরাপদ পানির অভাবে ভুগছে। একটি নলকূপ আছে, তবে তা বিদ্যালয়ের বাইরে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা মৌখিক ও লিখিতভাবে কর্র্তৃপক্ষকে বারবার জানিয়েছি, কিন্তু শুধু আশ্বাস ছাড়া কোনো সমাধান পাইনি।’

স্থানীয়রা ও অভিভাবকরা দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। তারা সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, ময়লা অপসারণের জন্য নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, পাবলিক টয়লেটের স্থান পরিবর্তন, মাদকসেবীদের আড্ডা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং ভাজাপোড়ার দোকান সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেন, এই সমস্যাগুলো সমাধান না হলে বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ আরও নাজুক হয়ে পড়বে, যা শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তারা আশা করছেন, সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ দ্রুত এ সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ নেবে এবং বিদ্যালয়টিকে শিক্ষার জন্য উপযুক্ত ও নিরাপদ পরিবেশে রূপান্তর করবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত