রোহিঙ্গা সংকট কেবল মানবিক নয়, বরং রাজনৈতিক, সামরিক ও ভূরাজনৈতিক সমস্যা। এর টেকসই সমাধানে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, ভোটাধিকার, চলাচলের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও চাপ ছাড়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়।
গতকাল বুধবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘নীতি গবেষণা কেন্দ্র’ আয়োজিত রোহিঙ্গা সমস্যার সংকট ও সমাধানবিষয়ক দিনব্যাপী কৌশলগত আলোচনায় বক্তরা এসব কথা বলেন। জাতিসংঘ অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংক্রান্ত কনফারেন্সকে সামনে রেখে এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
নীতি গবেষণা কেন্দ্র আয়োজিত এ সংলাপের প্রারম্ভিক বক্তব্যে সাবেক কূটনীতিক মোহাম্মদ সফিউর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পূর্বশর্ত হিসেবে মিয়ানমারে নাগরিকত্ব, ভোটাধিকার এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক শ্রম ও নিয়োগ বন্ধ করা, চলাচলের স্বাধীনতা দেওয়া এবং জমি-সম্পত্তির অধিকার পুনরুদ্ধারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।
আলোচনায় প্রধান অতিথি কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও সামরিক সমস্যা হিসেবে দেখতে হবে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন রোহিঙ্গা নীতিতে সীমাবদ্ধ থেকেছে উল্লেখ করে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আহ্বান জানান।
শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলে, রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যাবশ্যক এবং বাংলাদেশ আর নতুন করে কোনো রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেবে না। আশ্রিত রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ মাতৃভূমিতে ফেরত পাঠানোর জন্য সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী বছর রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যেতে পারবে, তবে তা সম্ভব হবে শুধু আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে। সরকার আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোকে যুক্ত করে এই সমস্যা দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করছে।
উপদেষ্টা আরও বলেন, তিনি রোহিঙ্গা ইস্যুতে দেশি ও বিদেশি পক্ষ, বিশেষ করে আরাকান ও মিয়ানমারের বিভিন্ন পক্ষকে নিয়ে গঠিত প্ল্যাটফর্মকে কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের গুরুত্বারোপ করেন।
আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অ্যালায়েন্সের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রোহিঙ্গা ইস্যু অন্তর্ভুক্ত করায় প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস ও তার সরকারকে ধন্যবাদ জানান। তার মতে, কোনো রাজনৈতিক বা দেশীয় হস্তক্ষেপ ছাড়া প্রত্যাবর্তন সম্ভব নয়।
নীতি গবেষণা কেন্দ্রের ট্রাস্টি ড. মাহবুবুল হক ‘ঢাকা ঘোষণাপত্র’ পাঠ করেন। এতে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন ছাড়া সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। ঘোষণাপত্রে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, সম্পত্তি ফেরত, চলাচলের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবিক সহায়তা, নারী ও যুবকদের সম্পৃক্ততা, আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি এবং গণমাধ্যমের নিরপেক্ষ ভূমিকার ওপর জোর দেওয়া হয়।
এ ছাড়া সংলাপে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সাংবাদিক ও দেশি-বিদেশি সংগঠনের নেতারা রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে তাদের মতামত তুলে ধরেন।
