ঔপন্যাসিক ও চিত্রনাট্যকার নাজিম-উদ-দৌলা বলেছেন, ‘এই দেশে লেখকের ভাগ্যে ক্রেডিট, সম্মান আর সম্মানি— তিনটার কোনোটাই ঠিকমতো জোটে না।’ সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া একটি সিরিজ প্রসঙ্গে তিনি এ মন্তব্য করেছেন।
আলোচিত বাংলা ছবি ‘সুড়ঙ্গ’সহ ‘শান’, ‘দামাল’, ‘অপারেশন সুন্দরবন’ ছাড়াও কিছু ওয়েব সিরিজের চিত্রনাট্য লিখেছেন নাজিম-উদ-দৌলা। বৃহস্পতিবার ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘এক স্ক্রিপ্ট রাইটার বড়ভাই একবার আমাকে বলেছিলেন, ‘নাজিম, তুমি যেদিন দেখবে যে তোমাকে লেখার জন্য ক্রেডিট দেওয়া হচ্ছে না, অথচ তাতে তোমার গায়ে লাগছে না, সেদিনই বুঝবে তুমি প্রফেশনাল স্ক্রিপ্ট রাইটার হয়ে গেছো।’’
‘সম্প্রতি আমি আবিষ্কার করলাম, আমার আর ক্রেডিট না পেলে গায়ে লাগে না। ‘ক্রেডিট কী খায়, না মাথায় দেয়’—এমন একটা অনুভূতি হয়! নিজের লেখা কনটেন্টের প্রমোশন করতেও মন চায় না। তাহলে কি আমি সত্যিই প্রফেশনাল হয়ে গেছি? না, আমি এটাকে প্রফেশনাল বলতে রাজি নই। এটা আসলে ফরমায়েশি রাইটার হয়ে যাওয়ার লক্ষণ।’
তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আচ্ছা, ক্রেডিট না হয় নাইবা পেলাম। কিন্তু সম্মান আর সম্মানী কি ঠিকঠাক পাচ্ছি? আমাকে অনেকেই দেশের প্রথম সারির স্ক্রিপ্ট রাইটারদের একজন মনে করেন। আর প্রথম সারির রাইটার হওয়ার কারণে, বঞ্চিত রাইটারদের তালিকায়ও আমার নামটা শুরুতেই আছে।’
‘যেসব প্রোডাকশনের সাথে আমি কাজ করেছি, তাদের অনেকের কাছেই আমার অনেক টাকা পাওনা আছে। সেই টাকা চাইতে গেলে এমন ভাব করে যেন আমি ধার চাচ্ছি! মাঝেমাঝে মিথ্যা কারণ দেখিয়ে তাদেরকে বোঝাতে হয়, কেন টাকাটা আমার দরকার। চিন্তা করেন অবস্থা’
‘আর সম্মানের কথা কী বলব? বিভিন্ন অ্যাওয়ার্ড ফাংশনের আয়োজকরা লেখকদের ইনভাইট করে না। এমনকি আমি নোমিনেশন পেয়েছি এমন অনুষ্ঠানেও আমাকে ইনভাইট করে নাই। আচ্ছা, তারা তো বাইরের লোক। প্রযোজক-পরিচালকদের কাছেও তো রাইটার গুরুত্বপূর্ণ কেউ না! তাদের ভাবখানা এমন যে লেখালেখি খুব সহজ কাজ, কলম ঘুরালেই বের হতে থাকে। সাংবাদিকরাও কোনো গুরুত্ব দেয় না লেখককে। এখন পর্যন্ত আমি বহুবার লেখকদের সাথে হওয়া অন্যায় নিয়ে আওয়াজ তুলেছি, কিন্তু কোনো সাংবাদিক তা কভার করে নাই। এমনকি, ফেসবুকের বিনোদনমূলক কনটেন্ট পেইজগুলোও কখনো লেখকদের পাশে দাঁড়ায় নাই।’
নাজিম-উদ-দৌলা উল্লেখ করেন, ‘অনেকেই জানেন না, এই লেখালেখির পেছনে আমার অনেক স্যাক্রিফাইসের গল্প আছে। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগ থেকে বিবিএ-এমবিএ করেছি, সিজিপিএ ৩.৭+ ছিল। দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগও পেয়েছিলাম দুই বার, কিন্তু যাইনি। ভালো কর্পোরেট চাকরি ছেড়ে অ্যাড এজেন্সিতে যোগ দিয়েছিলাম শুধু ক্রিয়েটিভ কাজের টানে। বিজ্ঞাপনের স্ক্রিপ্ট লিখতে লিখতে একসময় সিনেমা-সিরিজের স্ক্রিপ্ট রাইটিং-এ ঢুকে পড়ি। কীভাবে যেন আমার সাইড জবটা মেইন জব হয়ে গেল! গত দুই-তিন বছর ধরে বিজ্ঞাপনের জগৎ ছেড়ে পুরোপুরি স্ক্রিপ্ট রাইটিং-এ মনোনিবেশ করেছি।’
‘এই কাজ করে আমি আর্থিকভাবে খুব বেশি ভালো না থাকলেও, মানসিক প্রশান্তি পেয়েছি। যে কাজটা করতে আমার ভালো লাগে, সেটাই তো করছিলাম! কিন্তু ফরমায়েশি রাইটার রূপে নিজেকে আবিষ্কার করার পর থেকে সেই মানসিক শান্তিটাও উবে গেছে।’
‘আমি ফরমায়েশি রাইটার হতে চাইনি, চেয়েছিলাম ক্রিয়েটিভ রাইটার হতে। ক্রিয়েটিভ রাইটারের ক্রেডিটের ক্ষুধা থাকবেই। অনেক ক্ষেত্রে টাকা না পেলেও তারা খুশি থাকে, কিন্তু নিজের ব্রেইন-চাইল্ডের জন্য ক্রেডিট না পেলে কি চলে? আফসোস, এই দেশে লেখকের ভাগ্যে ক্রেডিট, সম্মান আর সম্মানি— তিনটার কোনোটাই ঠিকমতো জোটে না।’
তিনি আরও লেখেন, ‘আমার পাঠকরা আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছে, তার প্রতিদান আমি দিতে পারিনি। আমার লেখা সিনেমা বা ওয়েব কনটেন্ট মুক্তি পেলে তারা দলবেঁধে দেখে। প্রায়ই মানুষ আমাকে বলে, ‘ভাই, শুধুমাত্র আপনার নামের কারণেই কনটেন্টটা দেখেছি।’ অথচ সেই আমার নামটাই প্রোডাকশন হাউজ থেকে বলতে চায় না। তারা এটাও বোঝে না যে লেখক হিসেবে আমার নামটা থাকা মানে একটা বাড়তি প্রমোশন।’
‘যাই হোক, মাস দুয়েক আগে আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ফরমায়েশি স্ক্রিপ্ট রাইটিং ছেড়ে দেব। তথাকথিত ‘প্রফেশনাল’ স্ক্রিপ্ট রাইটার আমি হতে চাই না। যেসব পরিচালক-প্রযোজকদের কথা দিয়ে রেখেছি, তাদের কাজগুলো শেষ করব। এরপর আর কোনো কাজ করব না, যদি না কেউ আমাকে প্রাপ্য সম্মান আর সম্মানি দিতে পারেন।’
‘আমি ইতোমধ্যে আমার আগের পেশায় ফিরে এসেছি। আমি একটা স্টার্টআপ সফট লঞ্চ করেছি। আপাতত এটাই আমার ফোকাস। তবে দুশ্চিন্তার কিছু নেই, একজন নাজিম-উদ-দৌলা না লিখলে এই ইন্ডাস্ট্রির কোনো ক্ষতি হবে না। ইনফ্যাক্ট, যে তলানিতে নেমে গেছে ইন্ডাস্ট্রি, তার চেয়ে নিচে তো আর নামা সম্ভব না!’
তিনি বলেন, ‘আমার পাঠকরা হতাশ হবেন না, আপনাদের জন্য মাঝে মাঝেই গল্প নিয়ে হাজির হব। সাহিত্যে আরও বেশি মনোযোগী হব। এই পর্যন্ত আসার পেছনে আপনাদের অনেকের আশীর্বাদ, ভালোবাসা ও উৎসাহ ছিল। আপনাদের প্রতি আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। আমার জন্য দোয়া রাখবেন।’
