এই লজ্জা কি ক্রিকেটের প্রাপ্য

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৭:২৫ এএম

আরব আমিরাতে চলমান এশিয়া কাপ ঘিরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার রাজনৈতিক বৈরিতা এখন নগ্নভাবে প্রকাশিত। গত রবিবার দুই দেশের ম্যাচ উপলক্ষে তার আগে থেকে শুরু হওয়া এ দ্বন্দ্বে দিনশেষে হেরে যেতে হচ্ছে ভদ্রলোকের খেলা ক্রিকেটকেই। এমনকি বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসিও গান্ধারির মতো চোখে পট্টি বেঁধে রেখেছে বিসিসিআই ও পিসিবির ক্রিকেট রাজনীতির এমন প্রেক্ষাপটের সামনে।

এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের আয়োজন করা সবচেয়ে বড় ক্রিকেট উৎসব হলো এই আন্তঃমহাদেশীয় প্রতিযোগিতা এশিয়া কাপ। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিটি এশিয়া কাপই এখন দুই দেশের টানাটানির খেলায় পরিণত হয়েছে। অবস্থা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আগেভাগেই আন্দাজ করা যায় কীভাবে কী ঘটবে। বৈশ্বিক রাজনীতি তো রয়েছেই, প্রতিবেশী দুই দেশ এখন প্রায় সব বিষয়ে পোষণ করে দ্বিমত। আর সেটা এবার আরও তীব্রভাবে দেখা গেল এশিয়া কাপের মঞ্চে। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলা, এরপরে ভারতের অপারেশন সিঁদুর ও পাকিস্তানের অপারেশন বুনিয়ান-উন-মারসুসের ফলে এবারের আসরটি মাঠে গড়ানো নিয়েই সংশয় ছিল। এমনকি ভারতীয় ক্রিকেটাররাও আশা করেননি টুর্নামেন্টটি মাঠে গড়াবে। তবুও ঢাকায় এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের বৈঠকে শারীরিকভাবে উপস্থিত না হয়েই বিসিসিআই সম্মতি দেয় এশিয়া কাপ-২০২৫ আয়োজনের। আর দ্বন্দ্ব ও হাইব্রিড মডেলের ঝঞ্ঝাট এড়াতে ভেন্যু ঠিক হয় সংযুক্ত আরব আমিরাতে।

তবে দিনশেষে অপ্রত্যাশিত এই টুর্নামেন্ট থেকে প্রত্যাশিত ফলই এসেছে। পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাত মেলাতে অস্বীকৃতি, ভারত অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদবের রাজনৈতিক মন্তব্য, আর প্রতিপক্ষের অহমিকা চরিতার্থ করতে টুর্নামেন্টকে জিম্মি করার চেষ্টা সবই এই পাঁচ দিনের ব্যবধানে দেখা গেছে এশিয়া কাপের মঞ্চে।

তাহলে এশিয়া কাপ-২০২৫ কেন আয়োজন করা হলো? সম্প্রচারভিত্তিক রোজগার প্রসঙ্গ বাদ দিলে এর উত্তর জানেন না কেউই! টুর্নামেন্টটিকেও অভিশপ্ত মনে করা হয়ে থাকে। এর আগে পাকিস্তান ১৯৯০-৯১ আসর থেকে সরে দাঁড়ায়, আর ১৯৯৩ সালের আসরই বাতিল হয় দুই দেশের রাজনৈতিক টানাপড়েনের কারণে। দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর অহংয়ের লড়াইয়ের বলি হয়ে কালে কালে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়েছে বাকি এশীয় দেশগুলোকে।

ভারত-পাকিস্তান ম্যাচগুলো আর ক্রিকেটে আটকে নেই; বরং এখন এটি দুই ক্রিকেট বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট রাজনীতিবিদদের অহমিকা ও রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি, তিনিই আবার এসিসির প্রধান। অন্যদিকে বর্তমান আইসিসির সভাপতি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ছেলে জয় শাহ ছিলেন বিসিসিআই সেক্রেটারি। পদে আসীন থাকায় সরাসরি কোনো পদক্ষেপ এ দুজনের কেউ নিতে পারেন না। কিন্তু পরোক্ষ প্রভাবে কী ঘটে তার প্রমাণ গত ১৪ সেপ্টেম্বরের ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ। ভারত জুড়ে বয়কটের ডাকের মধ্যেও বিসিসিআই পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলতে রাজি হয়। কিন্তু ম্যাচশেষে ভারতীয় ক্রিকেটাররা হাত মেলাতে অস্বীকৃতি জানায়, আর প্রতিপক্ষ এগিয়ে আসতেই সূর্যকুমার যাদবের দল ড্রেসিংরুমের দরজা বন্ধ করে দেয়। এর পেছনে যে রাজনীতি জড়িত তা বুঝতে বিদ্যাসাগর হতে হয় না। ক্রিকেটের চেতনা উপেক্ষা করার মতো এ কাণ্ডে আইসিসির নিয়মে কোনো শাস্তি নেই ঠিকই, তবে প্রশ্ন ওঠে এটি কি প্রয়োজনীয় ছিল? এ ঘটনার পরই আরেকটি শিশুসুলভ কাণ্ড ঘটে। পাকিস্তান অধিনায়ক সালমান আলি আগা ম্যাচ-পরবর্তী উপস্থাপনায় হাজির হতে অস্বীকৃতি জানান। আর অন্য পিঠে সূর্যকুমার যাদব জয় উৎসর্গ করেন পেহেলগাম হামলায় শহীদ ও ভারতীয় সেনাদের উদ্দেশ্যে।

এরপর পুরো দৃশ্যপটে বলির পাঠা বনে যেতে হয় ম্যাচ রেফারি অ্যান্ডি পাইক্রফটকে। ভারতের আচরণে স্বভাবতই অপমানিত বোধ করা পাকিস্তান সুযোগ খুঁজছিল। পিসিবি এ ক্ষেত্রে নিশানা বানায় পাইক্রফটকে। খবর ছড়ায়, পাইক্রফট টসের সময় দুই অধিনায়ককে হাত না মেলাতে বলেন। এরপর পিসিবি আইসিসির দ্বারস্থ হয় পাইক্রফটকে সরাতে, নইলে তারা আমিরাতের বিপক্ষে পরের ম্যাচ খেলবে না, বয়কট করে ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলন। ম্যাচের দিন হোটেল থেকে দেরিতে বের হওয়ায় এক ঘণ্টা বিলম্বে শুরু হয় খেলা। ম্যাচ না খেললে প্রায় ১৫ মিলিয়ন ইউএস ডলার লোকসান হতো সম্প্রচারক কর্র্তৃপক্ষের। ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বকে পুঁজি করার ভাবনা বুমেরাং হয়েছে সম্প্রচারকদের জন্য। ২০১০ থেকে ভারত ১৮ ওয়ানডেতে জিতেছে ১৩টিতে, ১২টি-টোয়েন্টিতে ৯টিতে। দুই দেশের খেলায় প্রতিযোগিতা না থাকলেও আগ্রহ কমেনি দর্শকদের। এশিয়া কাপে সম্প্রচারকরা কোটি কোটি টাকা খরচ করলেও টিকে আছে মূলত এই এক ম্যাচ দিয়েই।

ভারত-পাকিস্তানের এই রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে বহুবারই নির্দোষভাবে পিষ্ট হয়েছে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, এখন আবার আমিরাত। যদিও শ্রীলঙ্কা বিসিসিআইয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে আসরের আয়োজক হওয়ার সুবিধা পেয়েছে, বাংলাদেশ এতটা সৌভাগ্যবান হয়নি, পিসিবির ঘনিষ্ঠতার কারণে। এদিকে আমিরাত হয়ে উঠেছে নতুন যুদ্ধক্ষেত্র। দুই দেশই নিরপেক্ষ ভেন্যু হিসেবে এখানে খেলতে চায়। যেহেতু দুবাইয়ে আইসিসির সদর দপ্তর, তাই লড়াইটা এই অব্দি গড়ায়। ক্রিকেটের সঙ্গে রাজনীতি মেশানোয় আইসিসি উসমান খাজাকে তিরস্কার করতে পারলেও নিশ্চুপ থেকে যায় ভারত-পাকিস্তান ইস্যুতে।

তবে নাটকের শেষ অঙ্ক এখনো বাকি! আসছে রবিবার ফের মুখোমুখি হবে দুই দেশ। সব ঠিক থাকলে তার পরের রবিবারের ফাইনালেও আরও একবার খেলতে হতে পারে ভারত-পাকিস্তানকে। ক্রিকেটের জৌলুস নাকি রাজনীতি আর অহমিকার বড়াই এই খেলায় যেই জিতুক, হারতে হচ্ছে ক্রিকেটকেই। এই লজ্জা কি ভদ্রলোকের খেলাটির প্রাপ্য!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত