ইসরায়েলের পরবর্তী লক্ষ্য তুরস্ক?

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৪:৩৮ পিএম

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা, লেবানন, ইরান ও ইয়েমেনের পর সম্প্রতি কাতারে ইসরায়েলের বিমান হামলা তুরস্কে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই হামলার পরই তেলআবিবের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে আঙ্কারা সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

ঘটনার পরপরই মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক মাইকেল রুবিন সতর্ক করে বলেন, তুরস্ক হতে পারে ইসরায়েলের পরবর্তী লক্ষ্য। ন্যাটোর সদস্য হলেও তা হয়তো তুরস্ককে সুরক্ষা দিতে পারবে না। একইভাবে ইসরায়েলি বিশ্লেষক মেইর মাসরিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখেন, ‘আজ কাতার, কাল তুরস্ক।’

এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের একজন উপদেষ্টা কড়া ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেন, তুরস্কের ওপর হামলার চিন্তা করলে ইসরায়েলকে ভয়াবহ মূল্য দিতে হবে।

গত কয়েক মাসে ইসরায়েলি গণমাধ্যমে তুরস্ককে ‘সবচেয়ে বড় হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বিশেষ করে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের বাড়তি উপস্থিতি এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় তুরস্কের ভূমিকাকে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে ইসরায়েল।

গাজায় ইসরায়েলের হামলার প্রেক্ষিতে গত আগস্টে তুরস্ক ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থগিত করে কড়া বার্তা দেয়। আঙ্কারার দাবি, ইসরায়েল যেকোনো সীমা অতিক্রম করছে এবং এ পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সমর্থন রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে তুরস্কে ন্যাটো জোটের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কাতারের মতো ঘনিষ্ঠ মিত্রের ওপর ইসরায়েলি হামলার পরও পশ্চিমা শক্তিগুলোর দৃশ্যমান কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ধারণাকে জোরদার করার চেষ্টা করছেন। গত আগস্টে এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, অবশ্যই, আমি এ ধারণায় বিশ্বাস করি। তার এ মন্তব্যকে আঙ্কারা কেবল প্রতীকী হিসেবে দেখছে না, বরং তুরস্কের আঞ্চলিক কৌশলের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক হিসেবে বিবেচনা করছে।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান আল জাজিরাকে বলেন, ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ এর লক্ষ্য হলো এই অঞ্চলের দেশগুলোকে দুর্বল, অকার্যকর ও বিভক্ত করে রাখা।

এই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল কেবল গাজা বা পশ্চিম তীরেই সীমিত নেই। তারা সিরিয়া, ইয়েমেন, এমনকি তিউনিসিয়ায় গাজায় পাঠানো সাহায্য বহরেও হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি ইরানের ওপর সামরিক হামলায়ও সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে।

জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে তুরস্কের রাষ্ট্রদূত ও সিরিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত টম বারাক স্বীকার করেন, ইসরায়েল একটি ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী সিরিয়া চায় না। ইসরায়েলের আঞ্চলিক একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এই প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সিরিয়ার ওপর একাধিক হামলা, লেবাননের দক্ষিণে হিজবুল্লাহর ওপর আঘাত এবং ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ-এসবই ইঙ্গিত দেয় যে, ইসরায়েল আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের একে একে দুর্বল করতে চাইছে।

সাবেক তুর্কি নৌ-অ্যাডমিরাল এবং ‘ব্লু হোমল্যান্ড’ কৌশলের রূপকার সেম গুরদেনিজ বলেন, তুরস্ক ও ইসরাইলের প্রথম সংঘর্ষের ক্ষেত্র হতে পারে সিরিয়ার স্থল ও আকাশসীমা।

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ছায়ায় গ্রিস, গ্রিক সাইপ্রাস ও ইসরায়েলের সমন্বয়ে সাইপ্রাসে যে সামরিক ও গোয়েন্দা ঘাঁটি শক্তিশালী হচ্ছে, তা তুরস্কের ব্লু হোমল্যান্ড নীতিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ধারণা, কাতারে ইসরায়েলি হামলা, সিরিয়ায় আঞ্চলিক কর্তৃত্বের প্রতিযোগিতা-সব মিলিয়ে আঙ্কারার চোখে এখন ইসরায়েল একটি আগ্রাসী ও একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে পরিচালিত শক্তি। অন্যদিকে, তুরস্কও তার সামুদ্রিক ও আঞ্চলিক কৌশল নিয়ে এই আধিপত্যবাদকে চ্যালেঞ্জ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত