ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য সচিব হাজি মোস্তফা জামান। বর্তমানে সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে এলাকাবাসী ও নেতাকর্মীদের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৮ আসনের বিএনপির এই মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতার সঙ্গে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সিনিয়র রিপোর্টার ফয়সাল খান।
দেশ রূপান্তর : জুলুম-নির্যাতনের কারণে দীর্ঘ সময় মানুষের পাশে থাকতে পারেননি। সেই শৃঙ্খল ভেঙে এখন মানুষের কাছাকাছি যাচ্ছেন। কেমন সাড়া পাচ্ছেন?
হাজি মোস্তফা জামান : বিগত ১৫ বছর জনগণ বঞ্চিত ছিল। তাই নেতাকর্মীদের পাশাপাশি জনগণের পাশেও থাকতে হচ্ছে। বিশেষ করে এলাকার রাস্তাঘাট, গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ, ময়লাসহ নানা সমস্যায় পড়ছে মানুষজন। তাদের সমস্যা সমাধানে কাজ করতে হচ্ছে। আমাদের কার্যক্রম এবং গণসংযোগে মানুষের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। শুধু ঢাকা ১৮ বা ঢাকা ১৬ নয়, ঢাকা মহানগর উত্তরের ৮টি সংসদীয় আসনে বিএনপির প্রার্থীদের জয়ী করব। এই ৮টি আসন আমরা দেশনায়ক তারেক রহমানকে উপহার দেব।
দেশ রূপান্তর : নির্বাচনের জন্য তৃণমূলের নেতাকর্মীরা কতটা প্রস্তুত?
মোস্তফা জামান : আমরা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। নেতাকর্মীরা মুখিয়ে আছে। আমরা মানুষের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছি। দেশনায়ক তারেক রহমানের ৩১ দফা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছি। মানবিক কাজে, মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছি। কিছুদিনের মধ্যে কেন্দ্র কমিটি করা শুরু করব। আমরা আশা করছি, মানুষ বিএনপিকে বেছে নেবে। আমরা আশা করি, আমরা সবাই মিলে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করব। সেই নির্বাচনে মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে।
দেশ রূপান্তর : আপনি কোন আসন থেকে নির্বাচন করবেন?
মোস্তফা জামান : আমি ঢাকা-১৮ আসনের বাসিন্দা। নেতাকর্মী ও জনগণ চাচ্ছে এই আসন থেকে আমি যেন নির্বাচন করি। সে হিসেবে আমি এই আসন থেকে মনোনয়ন চাইব। দল যদি মনোনয়ন দেয় এলাকাবাসী এবং ত্যাগী নেতাদের নিয়ে উত্তরা, উত্তরখান, দক্ষিণখান ও তুরাগসহ ঢাকা-১৮ আসনের মানুষের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করব। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় মানবিক ও জনদুর্ভোগমুক্ত ঢাকা ১৮ আসন বিনির্মাণে সর্বসাধারণের পাশে থাকা আমার নৈতিক দায়িত্ব।
দেশ রূপান্তর : অনেক বছর পর বিএনপি রাজনীতির মাঠে সুবিধাজনক অবস্থানে এসেছে। নেতাকর্মীদের সামলাতে কোনো ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন?
মোস্তফা জামান : বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নির্যাতিত এবং বঞ্চিত নেতাকর্মীদের দিয়ে কমিটি করাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ৫ আগস্টের পর অনেককে দেখি যারা আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলেমিশে ছিল। আবার অনেক নির্যাতিত ত্যাগী নেতাকর্মীও আছেন। যারা স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাজপথে লড়াই সংগ্রাম করেছে, তাদের হাতে দলের নেতৃত্ব দিতে হবে। সুবিধাভোগীরা যাতে মাথাচাড়া দিয়ে কোনো অপকর্ম করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে আগাতে হচ্ছে।
দেশ রূপান্তর : রাজনীতির এই সময়টা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মোস্তফা জামান : ১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি, যার ফল পেয়েছি ২০২৪ সালে এসে। চব্বিশের ছাত্র-জনতার আন্দোলন আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের জুলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়। এই আন্দোলনে সব শ্রেণিপেশার মানুষ অংশ নিয়েছিল। যার কারণে আমরা একটা ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে মুক্তি পেয়েছি।
দেশ রূপান্তর : আন্দোলনের সময়গুলোর উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা মনে পড়ে?
মোস্তফা জামান : একদিন বাসায় খবর নিয়ে দেখি আমার ছেলে মেয়ে নেই। পরে জানতে পারলাম তারা আন্দোলনে গেছে। তাদের দেখাশোনা করতে আমার স্ত্রীও আন্দোলনে অংশ নেয়। আমি তাদের যেতে বলিনি, কিন্তু তারা নিজ থেকেই গেছে। এই আন্দোলনটা আসলে এমনই ছিল। শুধু আমার পরিবার নয়, সারা দেশের সব শ্রেণিপেশার মানুষ জুলুম থেকে মুক্তি পেতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে এসেছিল। সবাই এক থাকার কারণে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। আমরা এক না থাকলে শেখ হাসিনা আগের মতোই জুলুম নির্যাতন করে টিকে যেত। আগামীতেও আমরা এক থাকতে পারলে, এই দেশের কোনো ক্ষতি হবে না।
দেশ রূপান্তর : জুলাই আন্দোলনের অন্যতম হটস্পট ছিল উত্তরা। আপনারা এলাকার নেতা হিসেবে আন্দোলনে কীভাবে অংশ নেন এবং আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে আপনাদের ভূমিকা কী ছিল?
মোস্তফা জামান : প্রতিদিন আমাদের নেতাকর্মীরা স্পট ভাগ করে করে আন্দোলনে অংশ নিয়েছে। উত্তরা বিএনএস সেন্টারসহ বিভিন্ন জায়গায় ছাত্রদের ওপর হামলা চালায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এতে অনেকেই আহত হন। অনেকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে হামলাসহ নানা হয়রানিতে পড়েছেন। ছোট ছোট বাচ্চারা আহত হয়ে হাসপাতালে আসছে, তাদের কাছে চিকিৎসার টাকাও ছিল না। অনেকের রক্ত লেগেছে।
বিএনপির পক্ষ থেকে আমাদের প্রতি নির্দেশনা ছিল, আন্দোলনকারী যে দলেরই হোক না কেন, তার চিকিৎসাসহ সব ধরনের সহযোগিতা করা। আমরাও কোনো দল দেখিনি। যারাই আহত বা নিহত হয়েছেন তাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছি। রক্তের প্রয়োজন হলে রক্তের ব্যবস্থা করেছি। টাকার প্রয়োজন হলে টাকার ব্যবস্থা করেছি।
দেশ রূপান্তর : অনেক লোক তো মারা গিয়েছিল। শহীদদের লাশ নেওয়া ও দাফনের ব্যবস্থাপনা কীভাবে করেছেন?
মোস্তফা জামান : উত্তরার বিভিন্ন হাসপাতালে শত শত লোক মারা গেছে। অবাক করার বিষয়, মারা যাওয়া আন্দোলনকারীদের কবর দিতে পর্যন্ত বাধা দেওয়া হয়েছে। জুলাই আন্দোলনের অন্যতম যোদ্ধা মীর মুগ্ধ মারা যাওয়ার পর উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টর কবরস্থানে পুলিশ বাধা দেয়। তখন আমরা জানতাম না মুগ্ধ কে, তার বাবা বিএনপি করে কি না। আমাদের যুগ্ম আহ্বায়ক জহিরের ছোট ভাই হাজি শফিককে কল দেই। তাদের একটা পারিবারিক করবস্থান ছিল। আমি সেখানে মুগ্ধকে দাফন করার ব্যবস্থা করতে বলি। এরপর শহীদ মুগ্ধকে কামারপাড়া কবরস্থানে দাফন করা হয়। আমরা নৈতিক দায়িত্ব থেকে কাজগুলো করেছি।
একজন মহিলার (তার নাম এই মুহূর্তে ভুলে গিয়েছি) ছেলে শহীদ হয়েছে। ছেলের লাশ দেখতে থানায় গেলে ওই মহিলাকে থানা থেকে ধমক দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। পুলিশ ওই মহিলাকে বলেছে, ‘মারা গেছে, তাতে কি হয়েছে? এমন শত শত মারা যাচ্ছে। যাও এখান থেকে বের হয়ে যাও।’ এমন অসংখ্য শহীদের পরিবার আমাদের কাছে এসে তাদের অসহায়ত্বের কথা বলেছে। সাধ্য অনুযায়ী তাদের সাহস দেওয়া এবং সহযোগিতা করে পাশে থাকতে চেষ্টা করেছি। তখনকার সময় তো স্বাভাবিক কোনো পরিস্থিতি ছিল না। ওই সময় একজনের সঙ্গে দেখা করাও দুষ্কর ছিল। বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছে।
দেশ রূপান্তর: আপনাকে ধন্যবাদ।
মোস্তফা জামান : আপনাকেও ধন্যবাদ। আপনার মাধ্যমে দেশ রূপান্তরের পাঠকদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
