গাজায় অন্তর্বর্তী প্রশাসন, নেতৃত্বে টনি ব্লেয়ার!

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৬:১৭ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন শান্তি পরিকল্পনার অধীনে গাজায় যুদ্ধবিরতি-পরবর্তী অন্তর্বর্তী প্রশাসন পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। গতকাল শুক্রবার বিবিসি, দ্য ইকোনমিস্টসহ বেশ কয়েকটি ব্রিটিশ গণমাধ্যমে এমন পরিকল্পনার বিষয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, এ পরিকল্পনার আওতায় জাতিসংঘ ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থনে ‘গাজা ইন্টারন্যাশনাল ট্রানজিশনাল অথরিটি’ (গিটা) নামে একটি প্রশাসনের নেতৃত্ব দিতে পারেন ব্লেয়ার। গিটা পাঁচ বছরের জন্য গাজার ‘সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ও আইনি কর্র্তৃপক্ষ’ হিসেবে কাজ করবে এবং জাতিসংঘের ম্যান্ডেটের অধীনে পরিচালিত হবে। পরবর্তীকালে গাজার নিয়ন্ত্রণ ফিলিস্তিনিদের হাতে হস্তান্তর করা হবে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, এ পরিকল্পনায় হোয়াইট হাউজের সমর্থন রয়েছে। তবে টনি ব্লেয়ারের কার্যালয় জানিয়েছে, তিনি এমন কোনো পদক্ষেপ সমর্থন করবেন না, যা গাজার জনগণকে বাস্তুচ্যুত করতে পারে। টনি ব্লেয়ার ইতিমধ্যে গাজার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন। গত আগস্টে তিনি হোয়াইট হাউজে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন, যেখানে যুদ্ধ-পরবর্তী গাজা পরিচালনার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ জানিয়েছেন, ওই বৈঠকে বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তবে তিনি বৈঠকের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করেননি।

বিবিসি বলছে, পরিকল্পনাটি পূর্ব তিমুর এবং কসোভোর রাষ্ট্রে রূপান্তর প্রক্রিয়া তদারককারী আন্তর্জাতিক প্রশাসনের মডেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। গাজার অন্তর্বর্তী কর্র্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে মিসরের কাছে দক্ষিণ সীমান্তে স্থাপিত হবে। গাজায় স্থিতিশীলতা ফিরে এলে এ কর্র্তৃপক্ষ মূল ভূখণ্ডে স্থানান্তরিত হবে। এতে একটি বহুজাতিক বাহিনীও যুক্ত হতে পারে।

২০০৭ সালে ক্ষমতা ছাড়ার পর টনি ব্লেয়ার যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া ও জাতিসংঘের পক্ষে মধ্যপ্রাচ্য দূত হিসেবে কয়েক বছর কাজ করেছেন। তার লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিনে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা। গাজার অন্তর্বর্তী প্রশাসন নিয়ে ব্লেয়ারের সম্পৃক্ত তার খবর এমন সময়ে এসেছে, যখন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তিনি দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ট্রাম্পসহ অন্যান্য বিশ্বনেতার সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ভবিষ্যতে গাজার শাসনব্যবস্থায় হামাসের কোনো ভূমিকা থাকবে না এবং গোষ্ঠীটিকে নিরস্ত্র হতে হবে।

নেতানিয়াহুকে পশ্চিম তীর দখল করতে দেবেন না ট্রাম্প : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ইসরায়েলকে অধিকৃত পশ্চিম তীর সংযুক্ত করার অনুমতি দেবেন না। গতকাল শুক্রবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভাষণের আগে হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, আমি ইসরায়েলকে পশ্চিম তীর সংযুক্ত করতে দেব না; এটা হবে না। ট্রাম্প বলেন, তিনি সোমবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। ট্রাম্প আরও জানান, গাজা ইস্যুতে একটি চুক্তি ‘প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে’ রয়েছে। গাজায় চলমান যুদ্ধ ও পশ্চিম তীর দখল বন্ধের জন্য ইসরায়েল ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চাপের মুখে রয়েছে। বিশেষ করে যখন একের পর এক পশ্চিমা দেশ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। ইসরায়েলের ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলোর একটি অংশ পশ্চিম তীর সংযুক্তকরণকে এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ঠেকানোর উপায় হিসেবে দেখছে।

নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের উগ্র জাতীয়তাবাদীরা আবারও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের অংশ পশ্চিম তীরকে সম্পূর্ণভাবে সংযুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। ব্রিটেন ও জার্মানি জানিয়েছে, তারা ইসরায়েলকে এ ধরনের পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য সতর্ক করেছে। এর আগে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছিলেন, পশ্চিম তীর সংযুক্ত করা হবে নৈতিক, আইনি ও রাজনৈতিকভাবে অসহনীয় পদক্ষেপ। হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি এ বিষয়ে নেতানিয়াহু ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলেছেন। ট্রাম্প বলেন, আমরা গাজা ইস্যুতে একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি, হয়তো শান্তিরও। বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বক্তব্য রাখেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। তিনি বলেন, সোমবার ফ্রান্স ঘোষিত ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তিনি বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। ৮৯ বছর বয়সী আব্বাসকে নিউ ইয়র্কে সরাসরি উপস্থিত হওয়ার অনুমতি দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি যারা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে, সেই দেশগুলোকে ধন্যবাদ জানান মাহমুদ আব্বাস। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও পর্তুগালের মাধ্যমে যে স্বীকৃতির ঢেউ শুরু হয়, পরে তাতে যুক্ত হয় ফ্রান্স, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, মাল্টা, মোনাকো, সান মারিনো, আন্দোরা ও ডেনমার্ক।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এখনো ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিরোধিতা করছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এ ধরনের পদক্ষেপ হামাসকে পুরস্কৃত করার সমান। জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে মাহমুদ আব্বাস বলেন, হামাস ভবিষ্যতে কোনো সরকারের অংশ হবে না। সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান সাংবাদিকদের বলেন, আমার মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পশ্চিম তীরে সংযুক্তকরণের ঝুঁকি ও বিপদগুলো খুব ভালোভাবেই বোঝেন। গত বুধবার সকালে ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীর ও প্রতিবেশী জর্ডানের মধ্যে একমাত্র সীমান্ত পারাপার বন্ধ করে দেয় ইসরায়েল। এর ফলে পশ্চিম তীরের দুই মিলিয়নের বেশি ফিলিস্তিনি বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ হারান। আরও দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি, ইউরোপীয় কমিশন ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্যে সীমাবদ্ধতা আরোপ এবং দেশটির সরকারের উগ্রপন্থি মন্ত্রীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে গাজা যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় এটি হবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে কঠোর অবস্থান। এ সপ্তাহে মাইক্রোসফট ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি ইউনিটের জন্য কিছু সেবা বন্ধ করে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির এক তদন্তে দেখা যায়, তাদের প্রযুক্তি গাজায় মানুষের ওপর গণ-নজরদারির কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত