শ্রমিকদের কর্মবিরতি শেষ হতে না হতে এ বারে বাস মালিকরা রাজশাহী থেকে ঢাকাসহ দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকেই রাজশাহী থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই সময় চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোর থেকেও এসব রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাস মালিকরা বলছেন, বাস শ্রমিকরা মালিকদের অনেকটা জিম্মি করে ফেলেছে।
বেতন ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে বেশ কিছুদিন ধরেই দূরপাল্লার বাসের শ্রমিকরা আন্দোলন করে আসছিল। সবশেষ গত ২২ ও ২৩ সেপ্টেম্বর শ্রমিকরা কর্মবিরতি করায় ঢাকাসহ দূরপাল্লার বাস বন্ধ ছিল। ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকায় দুপক্ষের আলোচনার প্রেক্ষিতে সমঝোতা হয়। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাত থেকে এবারে বাস বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় বাস মালিকরা। ন্যাসনাল ট্রাভেলসের মালিক ফজলুর রহমান জানান, বাস শ্রমিকরা মালিকদের জিম্মি করে ফেলতে চায়। তাদের সঙ্গে ২৩ তারিখ ঢাকায় বসে সমঝোতা হয়। সেখানে বাস মালিক শ্রমিক সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে দুপক্ষের মধ্যে যেসব সমঝোতা হয় সেগুলো ভঙ্গ করছে শ্রমিকরা। তারা রাস্তায় যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠায় অথচ এটার নিয়ম নেই। বেতন বৃদ্ধির পরও তারা বাড়তি আরও সুবিধা আদায় করছে জোর করে। এসব কারণে বাস বন্ধ রয়েছে। বাস মালিক সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই রাজশাহী, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে দূরপাল্লার বাস চলাচল করছে না। কখন নাগাদ বাস চলতে পারে জানতে চাইলে ফজলুর রহমান জানান, সিদ্ধান্তটা কেন্দ্রীয় কমিটির নেওয়া। তারা যতক্ষণ নতুন সিদ্ধান্ত না নিতে পারবেন ততক্ষণ বাস বন্ধ থাকবে।
রাজশাহী জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম পাখি বলেন, মালিকদের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনার পর বাড়তি বেতন নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করে বাস্তবায়নের আগে বাস বন্ধ করা ন্যক্কারজনক। এতে যাত্রীরা যে ভোগান্তিতে পড়েছে তা বর্ণনার বাইরে।
এদিকে পূজার ছুটির আগে হঠাৎ বাস বন্ধ হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন যাত্রীরা। অনেকেই আগে থেকে টিকিট কেটে রেখেও কাউন্টারে এসে দেখছেন বাস বন্ধ। পরে তাদের টিকিট ফেরত নিয়ে টাকা ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে কাউন্টার থেকে। এদিকে, যাদের যাওয়া জরুরি তারা লোকাল বাস কিংবা ভিন্ন পথে গন্তব্যে যাচ্ছেন।
নাটোরের হানিফ পরিবহনের শ্রমিক সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘আমাদের কর্মবিরতি বেতন বৃদ্ধির জন্য। এর আগে এক বৈঠকে আমাদের বেতন বাড়ানোর কথা বলেছিল, মালিকপক্ষ কিন্তু করেনি। ১৫ বছর আগের যে বেতন ছিল, সেই বেতনই দিচ্ছে কোম্পানিগুলো। চাঁপাই টু ঢাকা একটা হেলপার পান ৫৩০ টাকা, সুপারভাইজার পান ৫৭০ টাকা। এক ট্রিপ শেষে আবার ২৪ ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। এভাবে মাসে ১১ থেকে ১২টি ট্রিপ পাই। এখন সবকিছুরই দাম বেশি। আমরা যে টাকা বেতন পাই, তা দিয়ে আমাদের সংসার চলে না। মানুষকে নিরাপদে এত দূরে পৌঁছায়; কিন্তু আমরা ন্যায্য বেতনটা পাই না। আমাদের দাবি, চাঁপাই থেকে ঢাকা আসা-যাওয়ার বেতন ধরতে হবে ২ হাজার ২০০ ও রাজশাহী ২ হাজার টাকা। সুপারভাইজার ১ হাজার ২০০ ও হেলপার ১ হাজার ১০০ টাকা। এই দাবি নিয়ে বাস বন্ধ রেখে তারা আন্দোলন করছিল।’
এ অবস্থায় পূজার আগে দুদিনের ছুটিতে বাস ও ট্রেনে যাত্রীচাপ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। হঠাৎ হানিফ এন্টারপ্রাইজ, কেটিসি হানিফ, দেশ ট্রাভেলস, ন্যাশনাল ট্রাভেলস, গ্রামীণ ট্রাভেলস এবং শ্যামলী বাস চলাচল বন্ধ হওয়ায় বিপাকে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা।
নাটোর জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুল মজিদ বলেন, মালিকদের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনার মাধ্যমে বাড়তি বেতন নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করে বাস্তবায়নের আগেই কোনো ঘোষণা ছাড়া বাস বন্ধ করা দুঃখজনক ঘটনা। এতে সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
এ বিষয়ে নাটোর জেলা বাস মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি লক্ষণ পোদ্দার কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে একতা ট্রান্সপোর্টের বাসসহ লোকাল বাসগুলো রাজশাহী-ঢাকা রুটে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঢাকা কোচ মাস্টার সমিতির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম শরিফ জানান, কদিন আগে ঢাকাগামী বাসের চালক ও তার সহকারীরা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে কর্মবিরতি পালন করেন। মালিকপক্ষের দাবি, ইতিমধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবু শ্রমিকরা তাদের বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি ঢাকাগামী বাসের প্রতিটি যাত্রায় বাসের যাত্রী পূর্ণ হওয়া সাপেক্ষে তিনটি করে সিটের ভাড়াও দাবি করেন। এমন অবস্থায় দাবি পূরণ সম্ভব নয়, উল্লেখ করে বাস মালিকরাই ধর্মঘটের ডাক দেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঢাকা বাসস্ট্যান্ড ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকাগামী যাত্রী পরিবহনের কাউন্টারগুলো বন্ধ রয়েছে। তবে, একতা পরিবহনের কয়েকটি বাস ছেড়ে গেছে।
বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের বহু যাত্রী বিপাকে পড়েছে। তাদের ঢাকা বাসস্ট্যান্ড থেকে বাড়ি ফিরে যেতে দেখা গেছে।
