বাংলাদেশ আজ এক অনিশ্চিত ও সংবেদনশীল মানবিক সংকটের মুখোমুখি। যা আন্তর্জাতিক দৃষ্টি ও স্থানীয় বাস্তবতার মধ্যে দ্বন্দ্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে। বর্তমানে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারে অবস্থান করছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম উদ্বাস্তু ক্যাম্পে পরিণত হয়েছে। এই জনসংখ্যা স্থানীয় সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তাজনিত কাঠামোর ওপর বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলছে। প্রতি বছর প্রায় ৩২ হাজার নতুন শিশু জন্ম নেয়, যা রোহিঙ্গা জনসংখ্যাকে দ্রুত বৃদ্ধির পথে নিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে রাখাইনের বাসিন্দা রোহিঙ্গার সংখ্যা কমে মাত্র পাঁচ লাখের নিচে নেমেছে। সেখানে চলমান নিপীড়ন, হত্যা, লুটপাট ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে মানুষকে নিজেদের মাতৃভূমি ত্যাগ করতে হচ্ছে। এভাবে একদিকে রাখাইন রোহিঙ্গাশূন্য হচ্ছে, অন্যদিকে বাংলাদেশে জনসংখ্যা চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা স্থানীয় জনগণের অধিকার, নিরাপত্তা এবং সামাজিক ভারসাম্যের জন্য হুমকি স্বরূপ। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আগমনের মূল কারণ চিহ্নিত ও প্রতিরোধ না করলে দীর্ঘমেয়াদে এটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং মানবিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। স্থানীয় জনগণ দীর্ঘ সময় ধরে রোহিঙ্গা সংকটের সরাসরি প্রভাব ভোগ করছে। কক্সবাজারের পরিবেশে এটি মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। বন উজাড়ের মাধ্যমে ক্যাম্প তৈরি হওয়ায় স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হয়েছে। বানর, সাপ, শকুন, বন্যশিকারি এবং স্থানীয় প্রাণী বিশে^র ওপর প্রভাব মারাত্মক। বনাঞ্চল হারানো মানে শুধু স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত নয় বরং মাটি ক্ষয়, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভূ-পরিবেশগত ভারসাম্যও বিঘ্নিত হচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের ফলে স্থানীয় জনগণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপে আছে। স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চাকরি এবং শ্রমবাজারে চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেয়েছে। চাঁদাবাজি, মাদক, খুন, অপহরণ এবং অন্যান্য গুরুতর অপরাধে রোহিঙ্গাদের জড়িত থাকার কারণে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ক্রমাগত ব্যস্ত। এই পরিস্থিতি কক্সবাজারকে কেবল বাংলাদেশের নয়, আন্তর্জাতিক পর্যটন শিল্পের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ করেছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত কক্সবাজারের ৩৩টি ক্যাম্পে সীমান্ত পেরিয়ে রাখাইন থেকে আরও দেড় লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় বৃহত্তম অংশ নারী ও শিশু। নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ১ লাখ ২১ হাজার রোহিঙ্গা নিবন্ধিত হয়েছে, বাকিরা নিবন্ধন ছাড়াই ক্যাম্পে বসবাস করছে। অনেক রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাইরে উখিয়া ও টেকনাফের বনভূমি এবং পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছে। এভাবে রোহিঙ্গা সংকট বহুমাত্রিক ও জটিল রূপ নিচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার অবস্থান স্থানীয় জনগণের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধি করেছে। স্থানীয়দের জীবনযাত্রা, খাদ্যনিরাপত্তা, শ্রমবাজার এবং পরিবেশ হুমকির মুখে। রোহিঙ্গাদের চাঁদাবাজি, মাদক, খুন, অপহরণের মতো অপরাধে জড়ানোয় পুলিশের নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। একটি অতিপ্রাসঙ্গিক বাস্তবতা হলো, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে দায়িত্বশীল পদক্ষেপের বাধাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ক্যাম্প কর্মকর্তাদের স্বার্থপর ভূমিকা। দীর্ঘদিন ধরে তারা স্বচ্ছন্দে এবং আত্মরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন হলে তাদের কর্মসংস্থান ও প্রকল্প তহবিল কমে যাবে, ফলে চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়। তাই তারা প্রায়ই সংকট সমাধানে গতি দেয় না।
কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী রোহিঙ্গা সংক্রান্ত প্রকল্প ও তহবিলের মাধ্যমে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। মানবিক দৃষ্টিকোণ ও নীতিমালার আড়ালে তাদের স্বার্থ প্রকৃত সংকট সমাধানকে ব্যাহত করছে। ফলে রোহিঙ্গা সমস্যার দীর্ঘায়ু এবং স্থানীয় জনগণের ওপর চাপ ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয় জনগণের প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা সীমিত। তরুণ প্রজন্ম মাদকের প্রভাবে ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছে। সামাজিক অস্থিতিশীলতা, অপরাধ, পর্যটন শিল্পের ওপর চাপ, দূষণ, ভূগর্ভস্থ পানিদূষণ, বর্জ্য সমস্যা এবং বনাঞ্চল ক্ষতি পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে পানি, স্যানিটেশন এবং মৌলিক পরিষেবার ঘাটতি সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করেছে। রাখাইনের পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল নয়। রাজনৈতিক সমাধান ব্যতিরেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হবে এবং সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত আরাকান আর্মি ২৮৮ জন জেলেকে আটক করেছে, যার মধ্যে ৯৫ জন বাংলাদেশি এবং ১৩৩ জন রোহিঙ্গা। বিজিবির প্রচেষ্টায় ১২৪ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। আরাকান-জান্তা রাখাইনে জ¦ালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসংকট সৃষ্টি করেছে। সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশ থেকে পাচারের বিপরীতে মিয়ানমার থেকে ক্রিস্টাল মেথ, ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা, কোকেনসহ বিপুল পরিমাণ মাদকপণ্য প্রবেশ করছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিজিবি ১২ কোটি টাকার বেশি নগদ অর্থ ও বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ করেছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৮৯৩ কোটি টাকা। ২,৬৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিচালনায় ডব্লিউএফপির তহবিল সংকট মানবিক সহায়তাকে সীমিত করেছে।
আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীর অর্থায়ন হ্রাসের কারণে ক্যাম্পে কর্মরত রোহিঙ্গারা চাকরি হারাচ্ছে এবং অনেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। চাকরি হারানো রোহিঙ্গা নারী রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছে। তহবিল সংকট অব্যাহত থাকলে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। সংকট সমাধানে বিকল্প কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং নারীদের জন্য পুনর্বাসন ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অত্যন্ত জরুরি। রোহিঙ্গা সংকট শুধু মানবিক নয়, বরং স্থানীয় অর্থনীতি, সামাজিক কাঠামো ও পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংকট সৃষ্টি করছে। বেকারত্ব ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, বাজারে নিত্যপণ্যের দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের পাশে রয়েছে। রাখাইনে তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে দ্রুত ও দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার রক্ষা, মিডিয়ার সচেতন ভূমিকা এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা এই সংকট সমাধানের মূল চাবিকাঠি। দল-মত নির্বিশেষে সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। এভাবে কেবল বাংলাদেশের নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানবিক দায়বদ্ধতাও নিশ্চিত হবে।
লেখক : কলামিস্ট
