আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এবং দলটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার বিরুদ্ধে উঠেছে নানা ‘অপকর্মের’ অভিযোগ। তার সঙ্গে জড়িয়েছে স্বজনদের নামও। বাহাউদ্দিনের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে অন্তত ৩০টি হিসাব রয়েছে। এসব হিসাবে বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন হয়েছে। তার একাধিক স্বজনের ব্যাংক হিসাবেও অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে পুলিশের দুটি বিশেষ ইউনিট। বাহাউদ্দিনের মতোই শতাধিক আওয়ামী লীগ নেতা ও তাদের ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ধরনের তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) চিঠি দিয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে।
সূত্রটি আরও জানায়, পুলিশের বিশেষ শাখার তালিকায় যাদের নাম এসেছে, তারা আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনামলে প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। প্রভাব খাটিয়ে এসব নেতা ও তাদের স্বজনরা বিপুল অর্থ উপার্জন করেছেন। স্বজন ও নেতাদের ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ বিদেশে পাঠানোর তথ্যও পাওয়া গেছে। একাধিক স্বজনের নামও তালিকায় রয়েছে। ইতিমধ্যে এই তালিকা পুলিশ সদর দপ্তর সরকারের উচ্চপর্যায়ে পাঠিয়েছে। এ ছাড়া পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এসব ব্যাংক হিসাবের ওপর নজর রাখছে। পুলিশের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের গোয়েন্দা ইউনিট ও দুদক আলাদাভাবে বিভিন্ন ব্যাংকে নেতাদের লেনদেনের তথ্য চেয়ে বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বেসরকারি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রায় এক মাস আগে পুলিশ, বাংলাদেশ ব্যাংকের গোয়েন্দা ইউনিট ও দুদক আলাদাভাবে তথ্য চেয়ে চিঠি দিয়েছে। আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা, তাদের স্বজন এবং তাদের সঙ্গে লেনদেনকারীদের তথ্য চাওয়া হয়েছে। আমরা এসব তথ্য সংগ্রহ করছি। বিশেষ করে নেতা ও তাদের স্বজনদের ব্যাংক হিসাবের তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তথ্য সংগ্রহের পর সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হবে। প্রায় সব ব্যাংকেই এ ধরনের তথ্য চাওয়া হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি।’
পুলিশ সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাবের লেনদেন সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। পুলিশ বিভিন্ন ব্যাংকে চিঠি পাঠিয়ে তাদের লেনদেনের তথ্য চেয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুদকও এ বিষয়ে নজরদারি করছে। নেতা, তাদের স্ত্রী, সন্তান বা নিকটাত্মীয়দের ব্যাংক হিসাবের গত ১৬ বছরের লেনদেন, বিশেষ করে বড় অঙ্কের টাকা জমা বা উত্তোলনের তথ্য চাওয়া হয়েছে।
পুলিশের এ পদক্ষেপকে অনেকে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ এটিকে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবেও বিবেচনা করছেন। পুলিশের এই উদ্যোগের পাশাপাশি বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ও দুদকও বিষয়টির ওপর নজর রাখছে। বিএফআইইউ সন্দেহজনক লেনদেন (এসটিআর) এবং বড় অঙ্কের নগদ লেনদেন (সিটিআর) রিপোর্ট বিশ্লেষণ করছে। এ ছাড়া দুদক সম্ভাব্য দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, এই ঘটনা সরকারের স্বচ্ছতা ও আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকারের একটি পরীক্ষা। যদি এই তদন্ত নিরপেক্ষ ও সুনির্দিষ্ট হয়, তাহলে তা দেশে দুর্নীতি দমনে একটি ইতিবাচক উদাহরণ তৈরি করতে পারে। নেতা ও তাদের স্বজনদের ব্যাংক হিসাবে পুলিশের নজরদারি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলবে বলে মনে হচ্ছে।
জানতে চাইলে পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক (অপারেশনস) রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পতিত আওয়ামী লীগ নেতা ও তাদের স্বজনরা বেশ বেপরোয়া ছিলেন। তাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে দেশ পিছিয়ে গেছে। নেতারা বিদেশে অর্থ পাচার করার ব্যাপক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। স্বজনরাও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। তাদের প্রতিটি বিষয় আমরা খতিয়ে দেখছি।’
পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, যাদের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেনÑশেখ হাসিনার নিকটাত্মীয় ও সাবেক সংসদ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, শেখ হেলাল উদ্দিন, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, সাবেক সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন আহমেদ নাসিম, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, শেখ সারহান নাসের তন্ময়, শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল, আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, বরিশালের সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ, রাজশাহীর সাবেক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ, শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল, দলের দপ্তর সম্পাদক ও শেখ হাসিনার সাবেক বিশেষ সহকারী বিপ্লব বড়–য়া, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম, নির্মল কুমার চ্যাটার্জি, শামীম ওসমান, নিজাম হাজারী, সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার ও তার মেয়ে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র তাহসিন বাহার, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত শিকদার, সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম সারোয়ার কবির, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ (ইনান), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি মাজহারুল কবির শয়ন, আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, রাউজানের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন মহারাজ, সাবেক সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুল প্রমুখ।
তাদের ব্যাংক হিসাবে কয়েকশ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। এ ছাড়া তাদের স্বজনদের ব্যাংক হিসাবেও অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে পুলিশের একটি গোপন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, কোটা সংস্কারের দাবিতে গত বছরের ১ জুলাই থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে আসছিল। এরই মধ্যে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের নির্দেশে ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। এমনকি পুলিশও তাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন করে। ১৬ জুলাই থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবন, মেট্রোরেল স্টেশন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, সেতু ভবন, বিভিন্ন থানা, পুলিশ ফাঁড়িসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও গাড়ি ভাঙচুর করে আগুন দেওয়া হয় এবং লুটপাট করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের গুলিতে ৮০০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। আবার দুর্বৃত্তদের হামলায় ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে।
গত বছর সরকার পতনের দিনই শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু নেতা সরকার পতনের আগে ও পরে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। অনেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। সাবেক আইনমন্ত্রীসহ প্রভাবশালী একাধিক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও কিছু ব্যবসায়ী, আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতারা পুলিশ ও র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন।
গত ১৬ বছর ধরে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন। তারা টেন্ডারবাজি, দুর্নীতিসহ এমন কোনো কাজ করেননি যা অবৈধ নয়। অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। কেউ কেউ ভারত, দুবাই, জার্মানি, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে পালিয়েছেন।
