গাইবান্ধার এক নিভৃত গ্রাম রতনপুর। গ্রামটি ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া ইউনিয়নের অন্তর্গত। এই গ্রামেই বাস করেন আমিরন বিবি (৬০)। ব্রহ্মপুত্র নদের তীরেই তার বাড়ি। রবিবার বিকেলে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে বসেছিলেন তিনি। ছবি তোলার সময় লজ্জায় ঘোমটা দিলেন। কি করছেন নদের তীরে, জানতে চাইলে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর বললেন, ‘কি আর করমো বাবা, আগে হামারঘরে ম্যালা জমিজমা, ঘরবাড়ি আছিল। একন সগকিচু নদীর মদ্দে গ্যাচে। মাঝেমদ্দে নদীর পারোত বসি, পুরানা দিনের কতা চিনতা করি, তোমরা হামার কসটের কতা শুনি কি করব্যার’।
যেতে যেতে আমিরন বিবি আরও বললেন,‘জমিজমা, ঘরবাড়ি নদীত গ্যাচে, হামরা তার ক্ষতিপূরণ চাইনে, নদী ভাঙন থাকি হামারঘরোক বাঁচাও বাবা’। এ সময় আমিরন বিবির মত অন্তত ১০ জন একই মন্তব্য করলেন।
তাদের উপজেলায় এবার অসময়ে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন দেখা দিয়েছে। শুকনো মৌসুমে দ্রুত পানি নেমে যাচ্ছে। পানি নেমে যাবার সঙ্গে সঙ্গে নদের তীর ভেঙে যাচ্ছে। গত একমাসে রতনপুর গ্রামের প্রায় ২০ বিঘা আমন ধানের জমি ও অসংখ্য ঘরবাড়ি ও গাছপালা বিলীন হয়েছে। হুমকির মুখে পড়েছে অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি। নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে অন্তত ১৫টি বাড়ি। অনেকেই অন্যের বাড়িতে বসবাস করছেন। স্থানীয় একটি মসজিদ হুমকির মুখে রয়েছে।
রোববার সরেজমিনে দেখা গেছে, নদী ভাঙা মানুষের দুর্ভোগের চিত্র। কেউ ঘরবাড়ি ও কেউ আসবাবপত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কেউ গাছ কেটে নিচ্ছেন। তীর ঘেঁষে জমি থেকে ফসল কেটে নিয়ে যাচ্ছেন।
মধ্য রতনপুর গ্রামের কৃষক আবদুস সাত্তার (৭০) বললেন, গত একমাসে আমার আমনের দুইবিঘা আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ঘরবাড়ি হুমকির মুখে। যেভাবে প্রতিদিন ভাঙছে, এভাবে ভাঙতে থাকলে অল্পদিনের মধ্যে গোটা গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কিন্তু ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
একই গ্রামের কৃষক জামাত আলী (৩৫) বলেন, একমাসের ব্যবধানে আমার তিনবিঘা জমির আমন ধানগাছসহ নদীতে চলে গেছে। একদিকে প্রচণ্ড রোদ ও গরম, অন্যদিকে নদী ভাঙনের ভয়। আমরা খুব বিপদে আছি।
তিনি আরও বলেন, ‘কয়বচর আগোত হামরা গেরেসতো আচিনো হামারঘরে জমাজমি, বাড়িভিটা সগি আচিলো। নদী ভাঙি হামরাঘরে একন কিচুই নাই। কামলার কাম না করলে দিন যায় না।’ ওই গ্রামের গৃহিণী রুপালি বেগম (৪৮) নিজের ভাষায় বলেন, ‘নদী হামারঘরে সবকিচু কারি নিচে। এ্যাক বিগে জমি আচিলো, তাও ২৫ দিন আগোত নদীত চলি গেচে।’
এলাকাবাসীর অভিযোগ, বর্তমানে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ ফুট পরিমাণ এলাকা ভেঙে যাচ্ছে। ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে তাগাদা দেওয়া হয়েছে।
এসব বিষয়ে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুল হক মুঠোফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, নদীতে পানি বৃদ্ধি ও কমে যাওয়ার সময় ভাঙন দেখা দেয়। স্থায়ী সমাধনের জন্য একটি প্রকল্পের সমীক্ষা করা হয়েছে। বরাদ্দ আসলে কাজ করা হবে। তবে এই মুহূর্তে রতনপুর গ্রামে ভাঙন রোধে কোন কর্মসূচি নেই।
